শরিফুল হাসান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবি মেট্রোরেল হলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে। বরাবরের মতোই বামেরা এই আন্দোলনে আছেন। আর বিএনপি হোক আওয়ামী লীগ হোক ক্ষমতাসীনদের ভাষ্য সবসময়ই এক। তারা সব সময়ই সরকারের সব উন্নয়নের পক্ষে থাকে। কাজেই এবারও থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আর সে কারণেই ছাত্রলীগের সাবেক বর্তমান সবাই মেট্রোরেলের গুন কীর্তন করছেন। আমি জানি আজকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এরা এই আন্দোলনে সবার আগে থাকত। হাজারটা যুক্তি খুঁজে পেত মেট্রো রেলের বিপক্ষে। অথচ আজ তারাই মেট্রোরেলের পক্ষে ফেসবুক গরম করছেন।
যাই হোক মূল প্রসঙ্গে আসি। উন্নয়নের জন্য গণপরিবহন আর সে কারণে মেট্রোরেল হবে এটা তো বাস্তবতা। কিন্তু কথা হলো সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে কেন? আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে গেলেই বা সমস্যা কী কী? এ নিয়ে যৌক্তিক তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য। কারোই গো হয়ে বসে থাকা ঠিক না। সেই ভাবনা থেকেই কয়েকটা কথা বলি।এক্ষেত্রে মেট্টোরেলের নিরাপত্তার দিকটা আমার বেশি মাথায় এসেছে।
কেউ কেউ বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে গেলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে। আমি এই যুক্তির সঙ্গে মোটেও একমত নই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আট বছর লেখাপড়া করেছি। তিন তিনটা ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোন লেখাপড়া হয় না, যে মেট্রোরেল হলে লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। এখানে যারা লেখাপড়া করে তারা হলে কিংবা লাইব্রেরিতে শত সমস্যার মধ্যেও পড়ে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মাইকের আওয়াজ, বহিরাগতদের উৎপাত, বিভিন্ন দিবসের উৎপাত লেগেই থাকে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন যে অবস্থান তাতে একপাশে নিউমার্কেট, একপাশে ঢাকা মেডিকেল, শাহবাগে দুই দুইটা বড় হাসপাতাল, একপাশে হাইকোর্ট। এসব কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে ২৪ ঘণ্টাই বহিরাগতদের অবাধ চলাচল। আমরা যত কথাই বলি বহিরাগতদের তো ঠেকাতে পারবে না?
আচ্ছা আপনি আমি যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি বা এখনো পড়ছেন সত্যি করে বলুন তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কী খুব বেশি লেখাপড়া হয়? নাকি ছাত্ররা নিজে নিজে পড়ে। আমার মনে হয় না ক্লাসরুম থেকে এখানে লোকজন খুব বেশি শেখে। আর শিখলেও মেট্রোরেলের কারণে কলাভবন কিংবা কার্জন হলে কোন শব্দ যাবে না। কাজেই লেখাপড়ার পরিবেশ নিয়ে আমি চিন্তিত নই। যারা মনে করেন মেট্রোরেল হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় তাদের বলি পৃথিবীর বহু জাগায় মেট্রোরেলের স্টেশন আছে ক্যাম্পাসে। তাতে ক্যাম্পাসের কিছু যায় আসে না। বরং তাদের লেখাপড়ার মান আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। অবশ্য বাইরে স্টেশন অার যাই থাকুক এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের পরিবেশ কিন্তু নিরিবিল। আর আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন একটা বাজার।
এবার মূল পয়েন্টে আসি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে একটা ঐতিহ্যের নাম যেই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। স্বীকার করেন না নাই করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিক্ষার ধারণা নিয়ে। কিন্তু পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রাজনৈতিক কারণে। তবে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষার উন্নয়নে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনেক। সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে অনেক জ্ঞানী-গুনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন। তবে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষকদের একটা বড় অংশই চলে যায় ভারতে। এরপর শিক্ষায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ক্রমেই কমতে থাকে। উল্টোদিকে ভাষা আন্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯, ৭১ এবং সর্বশেষ ৯০ কিংবা ২০০৭-২০০৮ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনেক। আমার চোখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটা রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয় যার শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবদান অনেক। কাজেই মেট্রোরেল হলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে এই কথা কেউ বললে আমি তার সঙ্গে একমত নই।
এবার আসছি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। আর সে কারণেই এত লম্বা রাজনৈতিক ইতিহাস বলা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের চেয়েও মেট্রোরেল কিংবা যারা মেট্রোরেলের চড়বেন তাতে নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন তো নতুন কিছু নয়। ধরুন কোন বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরদার আন্দোলন হচ্ছে তখন যদি ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মেট্রোরেলের আক্রমণ করে, ঢিল মারে কিংবা আগুন দেয় তাহলে কী হবে? জাতীয় জাদুঘরের সামনে কিংবা দোয়েল চত্ত্বরে যদি আন্দোলনকারীরা কোনোভাবে মেট্রোরেল আটকে দেয়। কেউ কেউ হয়তো বলবেন মেট্রোরেল ওপর দিয়ে যাবে কাজেই আক্রমণ সম্ভব নয়। কিন্তু যদি জাতীয় জাদুঘর কিংবা দোয়েল চত্বর এই দুটো স্টেশনে ঢুকে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে আটকে দেয় তখন কী হবে? হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা কে দেবে? যারা আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেল চাইছেন তারা কী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে সেটা সম্ভব নয়। কাজেই নিরাপত্তাজনিত কারণে আমি কোনোভাবেই মেট্রোরেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে নেওয়ার পক্ষে নয়।
আরেকটা কথা বলি। আমি চাই আমার অপরাজেয় বাংলা, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি প্রতিটা জায়গা সংরক্ষিত হোক। মেট্রোরেল হলে এই জায়গা কিছুটা হলেও সৌন্দর্য হারাবে। আমি চাই না আমার ক্যাম্পাসের কোন সৌন্দর্যহানি হোক। এটা খুব শক্ত পয়েন্ট নয়, তবে আমি সুযোগ থাকলে আমার ক্যাম্পাসটা একই রকম রাখতাম। তবে কথা হলো চাইলেই কি আমরা সেটা পারি বা পেরেছি? উন্নয়ন কী আমরা অস্বীকার করতে পারবো? এই ক্যাম্পাসে বহুতলা ভবন হচ্ছে, ফ্ল্যাটবাড়ি হচ্ছে তাতে কিন্তু সৌন্দর্যা হারাচ্ছে। তাহলে মেট্টোরেল হলে সমস্যা কী?
এবার আরেকটা পয়েন্টে আসি। মেট্রোরেলের মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। উত্তরা (উত্তর), উত্তরা (সেন্টার), উত্তরা (দক্ষিণ), পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেইট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এলাকায়। এবার আসুন এই স্টেশনগুলো বিশ্লেষণে।
সোনারগাঁওয়ের পর জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর এরপর জাতীয় স্টেডিয়াম। একটু চিন্তা করে দেখুন তো জাতীয় জাদুঘর আর দোয়েল চত্বর দুটো স্টেশনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর পড়েছে। এতে কিন্তু খুব বেশি লাভ হবে না। কিন্তু জাতীয় জাদুঘরের পর যদি মৎস্যভবনে একটা স্টেশন করা যেতো এবং এরপর জাতীয় স্টেডিয়ামে নেওয়া যেতো তাহলে কিন্তু মালিবাগ, মৌচাক, রমনা, ফকিরাপুল, শান্তিনগরসহ ওইদিকে যারা যাতায়াত করবেন তাদের অনেক বেশি সুবিধা হতো।
মেট্রোরেল একবার হয়ে গেলে আর বদল করা যাবে না। কাজেই মেট্রোরেলের নিরাপত্তার স্বার্থে হোক অন্য কোন কারণেই হোক আমার মনে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে না গেলেই ভালো। তবে তারপরেও যদি কেউ আমাকে নিশ্চিত করতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর গিয়ে গেলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তার কোন সমস্যা হবে না বরং নানা দিক দিয়ে সুবিধাই হবে আমি মেনে নেবো। তবে দুই পক্ষের কাছেই অনুরোধ দয়া করে গোয়াতুর্মি না করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন। কারণ মেট্রোরেল আমাদের করতেই হবে। ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধানে এর বিকল্প নেই। কাজেই এমন কাজ করবেন না এমন কথা বলবেন না যাতে এই মেট্রোরেলের কাজ বাঁধাগ্রস্ত হয় বা পিছিয়ে যায়। কাজেই বিতর্ক করুন, তর্ক করুন, পক্ষ বিপক্ষের যুক্তি তুলে ধরুন। এরপর সরকার সিদ্ধান্ত নিক। এরপর দেশের জন্য যা মঙ্গল চলুন সবাই সেটা মেনে নেই।
