লাইফ ইজ বিউটিফুল

Spread the love

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। অানন্দময় সকাল। কারণ এই সাত সকালে অস্ট্রেলিয়া থেকে এক বড় আপু ইনবক্সে জানালেন মিনারের জন্য ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। তি‌নি এই টাকাটা জ‌মি‌য়ে‌ছি‌লেন সন্তা‌নের ল্যাপটপ কেনার জন্য। কিন্তু অামার স্ট্যাটাস প‌ড়ে তি‌নি তার বাচ্চা‌কে ব‌লেন শো‌নো কম্পিউটার কেনার চে‌য়েও দে‌শে একটা ছে‌লের জীবন বাঁচা‌নো জরুরী। তার সন্তানরাও সান‌ন্দে রা‌জি হ‌য়ে যায়।
ওই অাপুর ম‌তো আমার চেনা অচেনা আরও কতোজন যে সামর্থ্যম‌তো মিনা‌রের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেই তালিকা দিলে ফেসবুক পূর্ন হয়ে যাব। অথচ বার্ণ ইউনিট ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি মিনারকে চিনতাম না। কিন্তু আজ মিনার আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ন ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মা কখ‌নো বকেন‌নি ব‌লে সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই। আমার কাছে এটাই জীবন। স্কুল, কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মজীব‌নে আমার আশপাশে যারা ছিলেন অা‌ছেন সবাই সেটা জানেন। অামার কা‌ছে অা‌রেকজ‌নের পা‌শে থাকার নামই জীবন। আমি যে সাংবাদিকতা করি তার প্রধান কারণ বহু মানুষের সমস্যা নি‌য়ে লেখা যায়। সমাধানও হয়। বি‌সিএস থে‌কে শুরু ক‌রে কতো চাকুরিপ্রার্থী বা অসহায় মানু‌ষের সমস্যার সমাধান হ‌য়ে‌ছে অামার রিপো‌র্টে ভাব‌তেই ভা‌লো লা‌গে।
ব্যাংকে আমার কোন সঞ্চয় নেই। আমার কোন বাড়ি নেই। গাড়ি নেই। একমাস বেতন না হলে পরের মাসে এই ঢাকা শহরে কীভাবে চলবো আমার জানা নেই। কিন্তু এসব নিয়ে আমার কোন দুশ্চিন্তা নেই। যখন কোন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি নিজেকে আমার মনে হয় সুখী মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অন্তত একশ ছেলে আছে যাদের চাকুরি হয়েছে আমার একটা ফোনে বা কথায়। অা‌মি জা‌নি সব‌কিছুর মালিক অাল্লাহ। মানুষ হি‌সে‌বে অা‌মরা শুধু পা‌শে থাকতে পা‌রি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, হাসপাতালের চিকিৎসা, জরুরী রক্ত কতো প্রয়োজনে যে অাপ‌নি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন ভাব‌তেও পারবেন না।
‌নিজে‌কে বড় কর‌তে এ লেখা নয়। কারণ অ‌া‌মি বড় নই। এ লেখা কৃতজ্ঞতা জানা‌তে। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ যারা আমার প্রতি আস্থা রাখেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ যারা আমার সব পাগলামিতে সায় দেন। রিকশাওয়ালা মুচি ভিখারি থেকে শুরু করে পুলিশ, সাংবা‌দিক, ম্যাজিষ্ট্রেট, জজ ব্যারিস্টার সচিব মন্ত্রী সবার সাথে আমি সমানভাবে মিশি যদি বুঝতে পারি মানুষটা সৎ। কখ‌নো কোন‌দিন অামার সমস্যার কথা তারা শো‌নেন‌ি কিন্তু নানাসময় নানাজ‌নের সমস্যা নি‌য়ে অা‌মি তা‌দে‌র বিরক্ত ক‌রি। তারা সমাধা‌নের চেষ্টা ক‌রেন। অা‌মি কৃতজ্ঞ তা‌দের প্র‌তি। ত‌বে অা‌মি য‌দি বুঝতে পারি মানুষটা অসৎ তখন অাবার নিজেই সরে যাই তার অজান্তে।
গতকাল প্রথম আলোর এক ছোট ভাই জিজ্ঞাসা করলো ভাই আপনি কী করে টানা ১৪ বছর ধরে সাংবাদিকতায় আছেন? আপনার বিরক্ত লাগে না? আমি ওকে বলেছি লাগে। নানা কারণেই অনেক সময়ই মনে হয়েছে এই পেশা ছেড়ে চলে যাই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের হীনমন্যতা দেখে। চারপা‌শের প‌রিবেশ দে‌খে। শুধু সাংবাদিক কেন চারপাশের পরশ্রীকাতর মানুষ দেখে স্বার্থপর মানুষ দেখে মনে হয়েছে শুধু সাংবাদিকতা নয় দেশ ছেড়েই চলে যাই। কিন্তু যখুনি কোন বিপদে পড়া মানুষ দেখি কোন মানুষের সমস্যার কথা শুনি তখুনি সব ভুলে যাই। আজ বাংলাদেশে আছি বলেই না মানুষ আমার কথা শোনে। কৃতজ্ঞতা তা‌দের প্র‌তি যারা অামার কথা শো‌নেন।
এক ছোট ভাই কয়দিন আগে জানতে চাইলো আপনি ফেসবুকে লম্বা লম্বা স্ট্যাটাস দেন। এতো কিছু লিখেন। কী হয় এসব লিখে? আমি তাকে বললাম ফেসবুকে আমার লেখাজুড়ে থাকে মানুষ, দেশ, সমাজ। আমার কতো স্ট্যাটাস কতো মানুষের জীবন বদলে সহায়তা ক‌রে‌ছে সেটা অা‌মি জা‌নি। প্রতিদিন কতোজন কতো রকমের সমস্যা নিয়ে আসে। আমি বেশিরভাগেরই সমাধান করতে পারি না। অামার কষ্ট লাগে। যেটুকু পারি অাপনা‌দের জন্যই পা‌রি। কৃতজ্ঞতা তাই অাপনা‌দের প্র‌তি।
এই যে আমার একটা লেখায় একজন মানুষ তার বহু কষ্টে অর্জিত ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আরেকজনের পাশে দঁড়ায় সেটাই আমার প্রাপ্তি। অা‌মি জা‌নি কিছু মানুষ ফেসবুকে আমার লেখা পড়ে। ফেসবুকই আমাকে একসাথে বহু মানুষের সাথে যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছে যেটা আর কোন মাধ্যম পারেনি। এ কারণেই আমি ফেসবুকে লিখি। অাপনারা যারা পড়েন তা‌দের প্র‌তি কৃতজ্ঞতা।
আমি কবি নই, ওপন্যাসিক নই, নায়ক নই, রাজনীতিবিদ নই, অাম‌ি একজন চাল চু‌লোহীন মানুষ। অামার পর‌নে‌র সস্তা পাঞ্জা‌বি নি‌য়ে অাপন‌ি টিটকা‌রি কর‌তে পার‌বেন, অামি কেন একটাই স্যা‌ন্ডেল সবসময় প‌রি সেসব নি‌য়ে হাস‌তে পারেন, গীবত কর‌তে কর‌তে হাস‌তে পা‌রেন অামার দর্শন নি‌য়েও। কিন্তু অা‌মি হা‌সি জীব‌নের অান‌ন্দে।
অনেক কষ্ট বেদনা থাকলেও নিজেকে আমার মনে হয় সুখী মানুষ। কারণ অা‌রেকজনের মু‌খে হা‌সি ফোটা‌নোর অানন্দ অামি জানি। তাই রক্তের প্র‌য়োজন কিংবা যে কোন বিপ‌দে অ‌ফি‌সের সহকর্মী থে‌কে শুরু ক‌রে চারপা‌শের মানুষজন যারা অামা‌কে ডা‌কেন কৃতজ্ঞতা তা‌দের প্র‌তি। এই শহ‌রের ক‌তো বন্ধু তার ব্য‌ক্তিগত ক‌ষ্টের কথা সমস্যার কথা শুধু অামা‌কেই ব‌লে সেটা অা‌মি জা‌নি। কৃতজ্ঞতা অাপনা‌দের কা‌ছে যে অামা‌কে বন্ধু ভাবেন। ইট কাঠের এই ঢাকা শহরে মানুষ হিসেবে আমি বেঁচে আছি মানুষের জন্য এটাই আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। তাই কৃতজ্ঞতা মানু‌ষের কা‌ছে।
শুভ সকাল আনাদের সবাইকে। শুভ সকাল এই দুনিয়ার সব মানুষের জন্য। আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারি। লোকে আপনাকে পাগল বলবে, বোকা বলবে কিন্তু এই ছোট্ট জীবনটায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, দেখবেন জীবনের মানেই বদলে যাবে। নিজের কিছু না থাকলেও আপনি তখন বলতে পারবেন লাইফ ইজ বিউটিফুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.