চাহিদা কম, সরবরাহ স্বাভাবিক, কিন্তু বেড়ে গেছে চালের দাম

Spread the love

শরিফুল হাসান


সরবরাহ স্বাভাবিক। চাহিদা কমেছে। এর পরও হঠাত্ রাজধানীর বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে তিন থেকে ছয় টাকা বেড়ে গেছে। কারণ হিসেবে সেই পুরোনো গল্প শোনাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের, আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা চালকল মালিকদের। চালকল মালিকেরা বলছেন, সাত-আট দিন চালকল বন্ধ থাকায় দাম বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু তাঁরাই আবার স্বীকার করেছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দিচ্ছেন। চাহিদাও এখন একটু কম।তাহলে দাম বাড়ল কেন—এর জবাব নেই এই ব্যবসায়ীদের কাছে। কিন্তু ক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগে চিনির দাম নিয়ে যা হয়েছে, ঈদের পর চালের দাম নিয়েও তা-ই শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, তাদের হাতে চালের যথেষ্ট মজুদ আছে। প্রয়োজনে এ চাল বাজারে ছেড়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে এমন কথামালার পর সরকারের ব্যর্থতার স্মৃতি ক্রেতাদের আর চালের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আশান্বিত করছে না।মোহাম্মদপুরে গতকাল বিকেলে চাল কিনতে আসা একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগে যে মিনিকেট ৩০ টাকা ছিল, এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই চাল ৩৬ টাকা হয় কী করে? কারা এভাবে দাম বাড়াচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করা দরকার। তা না হলে চিনির মতোই পরিস্থিতি হবে।ঈদের আগে খুচরা বাজারে যে মোটা চাল ২২ থেকে ২৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন সেই চাল গতকাল শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ২৪ থেকে ২৭ টাকায়। একইভাবে মিনিকেট, নাজিরশাইল, পাইজামসহ সব ধরনের চালের দামই পাঁচ দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি তিন থেকে ছয় টাকা বেড়েছে।রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর, পলাশী বাজার, নবাবগঞ্জ ও বাবুবাজারের আড়তদারেরা বলছেন, এ মুহূর্তে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু চালকল মালিকেরা হঠাত্ দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে।অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, বাজারে কোনো জিনিসের চাহিদা বাড়লে দাম বাড়তে পারে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। ফলে চালের চাহিদা আগের তুলনায় কম।মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের খুচরা বিক্রেতা শাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এমনিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ মণ চাল বিক্রি করেন। ঈদের পর এখন পাঁচ থেকে সাত মণ চাল বিক্রি করতে পারছেন। কারণ, ঈদ করতে যাওয়া লোকজন এখনো ঢাকায় ফেরেনি। এই ব্যবসায়ী বলেন, চালের চাহিদা কমেছে। যখন যে পরিমাণ চাল প্রয়োজন, আড়ত থেকে তা পাওয়া যাচ্ছে। এর পরও কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।ঢাকায় চালের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বাবুবাজারের জনপ্রিয় রাইস এজেন্সির মালিক আব্দুল করিম বলেন, তাঁরা প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩৭৫ মণ চাল বিক্রি করেন। ঈদের পর এখনো সেভাবে বাজার শুরু হয়নি। বিক্রি খুবই কম। তিনি বলেন, তাঁরা নিয়মিত কুষ্টিয়া ও নওগাঁর মোকাম থেকে চাল আনেন। যেভাবে তাঁরা চাহিদা দিচ্ছেন সেভাবেই সরবরাহ পাচ্ছেন। কোনো সংকট নেই। কিন্তু মোকাম থেকে দাম বাড়ানো হয়েছে। চালকল মালিকেরা দাম বাড়িয়েছেন বলে তাঁদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।বাবুবাজার-কদমতলী চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, ওই মার্কেটে ২০০ দোকান আছে। গড়ে প্রতিদিন ১০ হাজার বস্তা বা ২৫ হাজার মণ চাল বিক্রি হয়। নিয়মিত মোকাম থেকে এই চাল আসছে। সরবরাহ স্বাভাবিকই আছে। কাজেই দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।ব্যবসায়ীরা জানান, রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ চালের জোগান আসে কুষ্টিয়া, নওগাঁ, দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চালকলগুলো থেকে। দেশে মোট ২৫ হাজার চালকল আছে, যার বেশির ভাগ চাল এই মোকামগুলোর মাধ্যমে বিক্রি হয়।নওগাঁ চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার আলম প্রথম আলোকে বলেন, ঈদ ও পূজার ছুটির কারণে বেশির ভাগ চালকল আট দিন ধরে বন্ধ। আরও আট-দশ দিন বন্ধ থাকবে। ফলে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কমেছে। তাই দাম কিছুটা বেড়েছে। মিলগুলো চালু হলে দাম কমে আসবে।তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১৮ দিনের বন্ধের এই তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই যেখানে ঈদ-পূজায় ১৮ দিন বন্ধ দেওয়া হয়।নওগাঁ জেলা ধান্যবয়রা শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি মোজাফফর হোসেন বলেন, নওগাঁর বেশির ভাগ চালকলে ঈদের জন্য মাত্র দুই দিন ছুটি ছিল। অধিকাংশ চালকলই এখন চলছে।ঈদ ও পূজার ছুটিতে কল বন্ধ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন দিনাজপুরের সবচেয়ে বড় চালকল আসিয়া রাইস মিলের মালিক শামীম চৌধুরী। তিনি বলেন, তাঁরসহ দিনাজপুরের বেশির ভাগ চালকলই খুলেছে। তবে তাঁর দাবি, সরবরাহ কম থাকায় চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। দিনাজপুর চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, গত সাত দিনে দিনাজপুরের মোকামগুলোতে চালের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ২০ টাকা। কারণ ধানের দাম বেড়েছে। তবে তিনিও স্বীকার করেন, চালের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত বছর বোরো, আমন ও আউশ মিলিয়ে মোট চালের উত্পাদন ছিল তিন কোটি ২৫ লাখ টন। দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ধরে এ বছর মোট চালের চাহিদা দুই কোটি ৮০ লাখ টনের মতো। এ বছর দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই, বরং উদ্বৃত্ত চাল রয়েছে। সরকারের গুদামেও ১২ লাখ টনের মতো চাল মজুদ আছে।দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চালের দাম নিয়ে কেউ কারসাজি করতে পারবে না। সরকারের কাছে ১২ লাখ টনের মতো চাল মজুদ আছে। প্রয়োজনে এই চাল কম দামে বাজারে ছেড়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে।চাল বাজারের হাল: মোহাম্মদপুর টাউন হলের মোহাম্মদীয়া চাউল ভাণ্ডারের বিক্রেতা ইব্রাহিম গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, ঈদের আগে মিনিকেট চাল ছিল ৩১ থেকে থেকে ৩৩ টাকা, গতকাল বিক্রি করেছেন ৩৬ থেকে ৩৮ টাকায়। উন্নত মানের নাজিরশাইলের কেজি ঈদের আগে ছিল ৪২ থেকে ৪৪ টাকা, এখন ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। সাধারণ নাজিরশাইল আগে ছিল ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৩৯ টাকায়। পাইজাম আগে বিক্রি হতো ২৩ থেকে ২৪ টাকায়, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২৬ থেকে ২৮ টাকায়।প্রায় একই রকম তথ্য জানিয়ে হাবিব রাইস স্টোরের মালিক শাহাবুদ্দিন বলেন, খুচরা বাজারে সব ধরনের চাল মণপ্রতি ১৪০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা বি.বাড়িয়া রাইস এজেন্সির মালিক মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ঈদের আগে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট তিনি বিক্রি করেছেন ৩০ টাকায়, এখন ৩৬ টাকা। মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ১৮ টাকায়, এখন ২২ টাকা। পাইজাম আগে ছিল ২২ টাকা, এখন ২৪ টাকা। নাজিরশাইল আগে ছিল ৩১ টাকা, এখন ৩৬ টাকা। তিনি আরও জানান, পাইকারি বাজারে সব ধরনের চাল কেজিপ্রতি তিন থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে।বাবুবাজারের পাইকারি চালের ব্যবসায়ী রশিদ রাইস এজেন্সির মনির হোসেন বলেন, পাইকারি বাজারে সব ধরনের চালের দাম মণপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে বেড়েছে আরও বেশি।মোহাম্মদপুরের চাল ব্যবসায়ী ইব্রাহিম বলেন, এবার ধানের ফলন ভালো। বাজারে চালের কোনো সংকটই নেই। কাজেই দাম বাড়ার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু হঠাত্ কুষ্টিয়ার চালকল মালিকেরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁদের বেশি দামে চাল কিনে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেন, হঠাত্ করে দাম বাড়ায় ক্রেতাদের কাছে জবাব দিতে দিতে তাঁরা ক্লান্ত। সরকারের উচিত চালকল মালিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা—কেন তাঁরা এভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছেন। চালকল মালিকেরা দাম কমালেই বাজার স্বাভাবিক হবে বলে মনে করেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.