শরিফুল হাসান
পরিচয় গোপন করে মাদক মামলার কারাবন্দী আসামিকে ১৭ দিন রাজধানীর জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের কেবিনে রাখা হয়েছে। রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমিরকে কারাবিধি ভঙ্গ করে একই হাসপাতালে ভাড়া বিছানায় রাখা হয়েছে ১৯ দিন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফারুক হত্যা মামলার আসামি। তাঁদের দুজনের কারোরই হূদরোগের সমস্যা ছিল না। দুজনই ভর্তি ছিলেন হাসপাতালের পরিচালকের অধীনে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুই কারাবন্দীকে দীর্ঘ সময় কারাগারের বাইরে থাকার সুযোগ করে দিতেই হাসপাতালের এই আয়োজন। এর পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সংঘবদ্ধ চক্র আছে বলে মনে করেন একাধিক চিকিৎসক। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, ওই হাসপাতালে এমন ঘটনা আরও ঘটেছে। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এই দুটি ঘটনার বিষয়েই নিশ্চিত হওয়া গেছে। জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো কারাবন্দীকেই কেবিন বা ভাড়া বিছানা বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম নেই। আর জরুরি প্রয়োজনে কাউকে বরাদ্দ দিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে সেটি জানাবে—এটাই নিয়ম। কিন্তু হূদরোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা করেনি। কোন স্বার্থে এমনটি করা হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা জরুরি। কারা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না—জানতে চাইলে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আবুল হোসেনকে কেবিনে নেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত কারারক্ষীরা আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শোনেনি। বিষয়টি জানার পর কারা কর্তৃপক্ষ আবুল হোসেনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) দিতে বলে। কয়েকবার চেষ্টার পর তাঁরা ওই ছাড়পত্র পান বলে জানান তিনি। কারা সূত্র জানায়, ওই ঘটনার কয়েক দিন পর আবুল হোসেন আবার হূদরোগ হাসপাতালে যেতে তদবির শুরু করেন। কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাঁকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। কারাবন্দী আবুল হোসেন ওরফে লিটন: তাঁর বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর ও সূত্রাপুর থানায় ডাকাতি ও মাদক আইনে চারটি মামলা আছে। হূদরোগ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করার সময় কারাবন্দী দেখানো হয়নি। ঠিকানা লেখা হয়েছে ১৫/৬ কল্যাণপুর। কিন্তু তাঁর পাহারায় ছিলেন পাঁচ কারারক্ষী। আবার হাসপাতাল থেকে তাঁকে আদালতেও নেওয়া হয়েছে হাজিরার সময়। নথিপত্রে দেখা যায়, আবুল হোসেনকে গত ২৬ সেপ্টেম্বর হূদরোগ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। তাঁর টিকিট নম্বর-৩৮৫০৫। জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ভর্তির কাগজে লিখেছেন, ‘আরএস (আবাসিক সার্জন) মহোদয়ের টেলিফোন নির্দেশ অনুযায়ী ১ নম্বর ইউনিটের অধীনে সার্জারির কেবিনে ভর্তি করা হলো।’ অবশ্য ওই দিন সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে ভর্তি করা যায়নি। পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে ভর্তি করা হয় (বহির্বিভাগ, টিকিট নম্বর-৩৮৬৭১)। রোগীর বয়স দেখানো হয় ৩৯ বছর। আগের দিন বয়স লেখা হয়েছিল ৩৬ বছর। হাসপাতালের রোগী ভর্তি ফরমে দেখা যায় (রেজি. নম্বর-৯৮৭৫) আবুল হোসেনের ভর্তির তারিখ ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা পাঁচ মিনিট। তাঁকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালের পরিচালক আবুল হোসেন খান চৌধুরীর অধীনে, ২০ নম্বর কেবিনে। ২৭ সেপ্টেম্বর ভর্তি দেখানো হলেও ওই কারাবন্দীকে কেবিন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক দিন আগে ২৬ সেপ্টেম্বর। তাঁকে কেবিনে নেওয়ার সুপারিশ করেন হাসপাতালের আবাসিক সার্জন কামরুল হাসান। তবে কামরুল হাসান প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি এমন কাউকে কেবিন বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করিনি।’ এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র আছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন কিছু বলার নেই।’ আবাসিক সার্জন কামরুল হাসান চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) দপ্তর সম্পাদক ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদেরও (স্বাচিপ) নেতা। এর আগে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিয়াক) হন এবং হূদরোগ হাসপাতালের আবাসিক সার্জনের দায়িত্ব পান। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে আসা রোগীদের ভর্তি নির্ধারিত ছিল ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটে। কিন্তু ওই মাদক মামলার আসামিকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালের পরিচালকের অধীনে। ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে ছিলেন। নেওয়া হয়েছিল আদালতে: আবুল হোসেনকে কারাবন্দী উল্লেখ না করলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তাঁকে মামলার হাজিরা দিতে আদালতে পাঠানোর সুযোগ করে দিয়েছে। ৭ অক্টোবর তিনি আদালতে যান। জনৈক নুরুল ইসলাম সেদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া অঙ্গীকারনামায় লিখেছেন, ‘২০ নম্বর কেবিনের রোগী আবুল হোসেন তাঁর ভাতিজা। ৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আদালতের কাজে আবুল হোসেনকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে হবে। এতে রোগীর কোন অসুবিধা হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।’ আতাউর রহমান: রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির আতাউর রহমানকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফারুক হত্যার পর গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে তিনটি মামলা আছে। ১৩ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত হূদরোগ হাসপাতালে ছিলেন তিনি। তাঁকে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পি-৪৩ নম্বর বিছানায় রাখা হয়। তিনিও হাসপাতালের পরিচালকের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আতাউর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১৩ জুন বিকেল চারটায় হূদরোগ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। হূদরোগী কি না, সন্দেহ হওয়ায় জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে ওই সময়ের দায়িত্বরত সহকারী অধ্যাপকের কাছে পাঠান। তিনি তাঁকে ভর্তির সুপারিশ করেন। রোগী ভর্তির রোস্টার অনুযায়ী, ওই দিন আসা রোগীদের ৬ নম্বর ইউনিটে ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু সেই ইউনিটে ভর্তি না করে আতাউরকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালের পরিচালকের অধীনে। আতাউরের বহির্বিভাগীয় রোগীর টিকিট নম্বর-১৪৬৬৮৯। রেজি. নম্বর: ৫৪৪২২/৮৮। তাঁকে ১৬ জুন হাসপাতালের ১৭ নম্বর কেবিনটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সেখানে যাননি। রোগও সঠিক নয়: কারাবন্দী আবুল হোসেনের চিকিৎসার নথিপত্রে কোথাও হূদরোগের সমস্যার কথা বলা হয়নি। হাসপাতাল থেকে তাঁকে যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলও স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছাড়পত্রে তাঁকে অর্থোপেডিক সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা নিতে বলা হয়েছে। আতাউর রহমানও হূদরোগী ছিলেন না। এ বিষয়ের প্রমাণ মেলে তাঁর বিভিন্ন রোগ পরীক্ষা এবং হাসপাতাল থেকে দেওয়া ছাড়পত্র থেকে। ১ জুলাই দেওয়া ছাড়পত্রে তাঁকে ডায়াবেটিস রোগী উল্লেখ করা হয়। কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কারাগারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এ কারণেই কোনো বন্দী গুরুতর অসুস্থ হলে বা অসুস্থ হওয়ার ভান করলে তাঁকে বাইরে পাঠানো হয়। এই দুই রোগীর মধ্যে আবুল হোসেন বুকে ব্যথার কথা জানিয়েছেন। তাই তাঁকে হূদরোগ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আতাউর রহমান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে হূদরোগ হাসপাতালে চিকিৎসার সুপারিশ নিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁদের সমস্যা না থাকলে হূদরোগ হাসপাতালে রাখাটা ঠিক হয়নি চিকিৎসকদের। পরিচালকের বক্তব্য: হূদরোগ হাসপাতালের পরিচালক আবুল হোসেন খান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ওই দুই রোগীর বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। দুজনেই আপনার অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন—এ তথ্য জানালে তিনি বলেন, ‘হতে পারে। কতজনই তো চিকিৎসাধীন থাকেন।’ নিয়ম ভেঙে তাঁদের আপনার ইউনিটে কেন ভর্তি করা হয়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজনে এক ইউনিটের বদলে অন্য ইউনিটে ভর্তি করা যেতে পারে। তাঁরা দুজনেই কারাবন্দী ছিলেন। কিন্তু ভর্তির কাগজপত্রে তা লেখা হয়নি কেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঠিকানা তো আমি লিখি না। এটি ভর্তির সময় যাঁরা কর্তব্যে ছিলেন, তাঁরা লিখেছেন।’ কারাবন্দীরা কেবিন কিংবা ভাড়া বিছানা পান না। ওই দুজন পেলেন কীভাবে—জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, ‘হয়তো সাধারণ সিট খালি ছিল না। তাই কেবিনে নেওয়া হয়েছে।’ কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কীভাবে এ বরাদ্দ হলো—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র না দেখে এ বিষয়ে বলা যাবে না।’ কাগজপত্র তো হাসপাতালেই আছে। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে এমন হাজার হাজার ডিসচার্জ লেটার আছে। খুঁজে পাওয়া কঠিন। আপনার কাছে যে কাগজ আছে, সেটি নিয়ে আসুন। আমরা সেটি দেখে মূল কাগজ বের করব।’ অবৈধ সুবিধাপ্রাপ্তদের একজন জামায়াত নেতা। এটা জানতেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছের লোক। কাজেই জামায়াতের নেতাকে সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’



