সংসদ উপনির্বাচন কাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩

Spread the love

প্রার্থীদের চাই ভোট, ভোটারদের দাবি এলাকার উন্নয়ন

শরিফুল হাসান


আগামীকাল বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের উপনির্বাচন। প্রার্থীরা ছুটেছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। সবখানেই এখন নেতাদের কাছে ভোটারদের বেশ কদর। কিন্তু কী চাইছেন এলাকার ভোটাররা? গত তিন দিন সদর ও বিজয়নগর এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সবাই চান চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কম থাকুক। এরপর এলাকার কিছু সমস্যার সমাধান আর প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হলেই খুশি তাঁরা। সমস্যা হলো, প্রতিবারই ভোটের সময় এই সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন নেতারা। কিন্তু নির্বাচনে জেতার পর দেখা যায় কেবল সাংসদেরই উন্নয়ন হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে সাংসদকে খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার সবচেয়ে বড় গ্রাম ভাদুঘর। ভোটার ১৫ হাজার। বাসিন্দা ৪০ হাজারের কাছাকাছি। গত সোমবার ওই গ্রামের পথেই দেখা হলো বৃদ্ধ আবদুল খালেকের সঙ্গে। একাত্তরে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এখন বেঁচে থাকার তাগিদে ভিক্ষা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অলিগলিতে। নির্বাচন নিয়ে তাঁর ভাবনা জানতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই বললেন, ‘দেশ স্বাধীন কইরা আমি আজক্যা ভিক্ষা করতাছি। আমার আর কী চাওয়া-পাওয়া? তার পরও আমি আমার লাইগ্যা নেতারার কাছে কুছতা চাই না। হেরা ভোটে জিইত্যা মানুষের লাইগ্যা কাজ করুক হেইডাই চাই।’ ওই গ্রামেরই কৃষক হামদু মিয়া। বললেন, ‘দেশের ভালো অইব এই আশায় বারে বারে ভোট দেই। কিন্তু যে ভোট পায়, খালি হে-ই ভালো থাকে। আমরা চাই এলাকার ভালো হোউক। রাস্তাঘাট ঠিক হোউক। চাইলের দামটা কমুক।’ গ্রামের একটি চাতালে কাজ করছিলেন কয়েকজন মধ্যবয়সী নারী শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে আসমা আকতার, ফেরদৌসী, সুচিত্রা রানীসহ আরও কয়েকজনের কাছে নির্বাচন নিয়ে ভাবনার কথা জানতে চাইলে হেসেই উড়িয়ে দেন তাঁরা। একপর্যায়ে আসমা আকতার বলেন, ‘ভোট তো প্রতিবারই দেই। কিন্তু চাইলের দাম তো কমে না। এক পুরা (আড়াই কেজি) চাইলের দাম ১০৫ টেহা। কিন্তু আমরা হারাদিন কাম কইরা পাই ৮০ টেহা। আমরা গরিবরা বাঁচাম কেমনে?’ ভাদুঘরের পাশেই সদর উপজেলার আরেক গ্রাম মোহাম্মদপুর। সেখানে একটি খেতে কাজ করছিলেন বৃদ্ধ ইবরাহিম মিয়া। নির্বাচন নিয়ে বললেন, ‘নৌকা মার্কার হ্যারাও ভোট চায়। ধানের ছড়ার হ্যারাও চায়। আমরাও ভোট দিয়া এমপি-চেয়ারম্যান বানাই। কিন্তু পাঁচ বছর আর হেরারে দেহি না। আমরা চাই এমপি যে-ই ওক, সমস্যার কথা যাতে বলতাম পারি। আর তারার কাছে অনুরোধ, তারা যেন চাইল-তেলের দামডা কমায়।’মোহাম্মদপুর গ্রামের কাছেই সদর উপজেলার রামরাইল-সুহাতা-কাছহাইট-মাছিহাতা-আটলা-পাঘাচং-চান্দপুর-সড়কটির বেহাল দশা। এবারের দুই সাংসদ পদপ্রার্থীর বাড়িই মাছিহাতা ইউনিয়নে। তাই এই এলাকার মানুষের দাবি, সাংসদ যিনিই হবেন, এবার যেন অন্তত এই রাস্তাগুলো ভালো হয়। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক লাগোয়া সদর উপজেলার আরেক গ্রাম মহিউদ্দিন নগর। শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে আসতে হলে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের মহিউদ্দিন নগরের সেতুটি পার হতে হয়। সেতুটি নড়বড়ে। জায়গায় জায়গায় ইস্পাতের তালি। কৃষক আবদুল কাদির, রহিম মিয়াসহ কয়েকজন সেতুটি দেখিয়ে বললেন, এবার যিনিই নির্বাচিত হন, এই ব্রিজটি যেন ঠিক হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়ন ও সাদেকপুর ইউনিয়নের লোকজনের ক্ষোভ এলাকার রাস্তা নিয়ে। এ দুই ইউনিয়নের সঙ্গে শহরের যোগাযোগকারী দাড়িয়াপুর-কালিসীমা-নরসিংসার-চিলোকুট সড়কের বেহাল দশা। এই রাস্তা দিয়ে দুটি রিকশার চলাচলও দায়। ওই রাস্তায় যেতে যেতে যতজনের সঙ্গে কথা হলো, সবার একটিই দাবি—এই রাস্তাটা ঠিক হোক। চিলোকুট গ্রামের আবদুস সালাম বলেন, এই এলাকা থেকে পাঁচবার সাংসদ নির্বাচিত হলেও রাস্তাটি ঠিক হয়নি। এ কারণে গত নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী হেরেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের দুই বছরেও এই এলাকার রাস্তা হয়নি। মানুষের একটিই দাবি, এই রাস্তাটি হোক। বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডের প্রধান কার্যালয় নাটাই ইউনিয়নে হলেও এখানকার গ্রামগুলোয় গ্যাসের সংযোগ নেই। ইউনিয়নের বেহাইর গ্রামের ওহিদ মিয়া বলেন, মানুষের একটাই দাবি, এখানে বড়িতে বাড়িতে গ্যাসসংযোগ দেওয়া হোক। তিতাস নদীর পূর্বপাড়ের নতুন উপজেলা বিজয়নগর। সেখানকার মানুষের আপাতত মূল দাবি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে যাওয়ার একটি রাস্তা। উপজেলার ব্যবসায়ী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিজয়নগরের সঙ্গে জেলা শহরের সংযোগকারী শিমনা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের তিন কিলোমিটার রাস্তা হলে খুব সহজেই শহরে যাওয়া যেত। রাস্তাটি হলে মানুষকে আর ৩০ কিলোমিটার ঘুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসতে হতো না। তাই এলাকাবাসীর প্রধান দাবি এই রাস্তা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আহ্বায়ক আবদুন নূর বলেন, সদর উপজেলাসহ পুরো জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি তিতাস নদীর খনন। দ্রুত এই নদীর খননকাজ শুরু হলে নদীটি নাব্যতা ফিরে পাবে। এলাকার সেচসহ অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাই ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে যিনিই সাংসদ নির্বাচিত হবেন, এই কাজটি যেন শুরু করেন। শহরের শিক্ষার্থীদের দাবি আবার ভিন্ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের ছাত্র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জেলার সবচেয়ে বড় এই বিদ্যাপীঠে ১৪টি বিষয়ের অনার্স কোর্স চালু থাকলেও মাত্র দুটি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। বাকি ১২টি বিষয়ে কোর্স চালু হোক, আমাদের দাবি সেটাই।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের ছাত্র মাসুকুর হূদয় বলেন, ‘এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি এই শহরে একটি মেডিকেল কলেজ হোক। মানুষ একটু ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাক। শহরের পুরোনো জেলখানা এলাকায় পাঁচ একর খালি জায়গা পড়ে আছে। সেখানে এই মেডিকেল কলেজ হতে পারে। যিনিই সাংসদ হবেন, আমাদের দাবি এখানে একটা মেডিকেল কলেজ হোক।’ শহরের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম, সঞ্জয় দেব, আল-আমিনসহ আরও অনেকে বলেন, এক রাস্তার শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ফলে সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকে। অথচ চাইলেই মৌলভীপাড়া ও কাজীপাড়ার সংযোগ সেতুটি যানচলাচলের উপযোগী করে সড়কগুলো প্রশস্ত করা যায়। একই সমস্যা আছে খালপাড়-কান্দিপাড়া সড়কেও। সমাধানই তো কাম্য। এই আসনে চারদলীয় জোটের মনোনীত পদপ্রার্থী খালেদ মাহাবুব। এলাকাবাসীকে তিনি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রচারণায় বলছেন, তিনি এলাকাবাসীর সব সমস্যার সমাধান করবেন। প্রথম আলোকেও বললেন একই কথা। কিন্তু তাঁর দল বিএনপি তো সংসদে যাচ্ছে না—নির্বাচিত হলেও কবে সংসদে যেতে পারবেন, এলাকাবাসীর উন্নয়নের জন্য কথা বলতে পারবেন বলে মনে করেন। জবাবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অনুকূল পরিবেশ হলে তাঁর দল নিশ্চয়ই সংসদে যাবে। এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী শেখ হাসিনার সাবেক একান্তসচিব র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এই এলাকার রাস্তাঘাট খারাপ, আছে আরও অনেক সমস্যা। এলাকাবাসীর এসব সমস্যার প্রতিটিই আমি জানি। অতীতেও আমি এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। সাংসদ নির্বাচিত হলে কথা দিচ্ছি, প্রতিটি সমস্যার সমাধান করব। এ জন্য সংসদ ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আমি নিজেই যাব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.