শরিফুল হাসান
আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মামুনুর রশিদ। কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ তাঁকে একটি যৌতুকের মামলায় েগ্রপ্তার করে৷
এর তিন মাস পর সহকারী জজ নিয়োগের (জুডিশিয়ারি) লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মামুন। গত ২৩ ডিসেম্বর ছিল তাঁর মৌখিক পরীক্ষা৷ এর আগের দিন একটি রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। গত ৮ জানুয়ারি মামুনের মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় এবং তিনি সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সরকারি চাকরিতে চূড়ান্ত নিয়োগের আগে নিয়মানুযায়ী এখন তাঁর পুলিশি যাচাই-বাছাই চলছে৷ এ পর্যায়ে এসে জানা গেল, খুলনা, ফেনী, মুন্সিগঞ্জে তঁার বিরুদ্ধে মামলা আছে৷ এসব মামলার একটিতে তাঁকে দোকান কর্মচারী হিসেবে উল্লেখ করা আছে৷ একটিতে বলা হয়েছে, তিনি স্ত্রী নির্যাতনকারী৷ পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থানে তঁার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম পাস করেছেন মামুন৷ বাবা কৃষক৷ মা গৃহিণী৷ বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের ভারীকোটা গ্রামে। মামুনরা ছয় ভাইবোন। বড় ভাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। ছোট ভাই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এক ভাই ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ছোট বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।
মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, কেউ একজন আছেন, যিনি চান না আমি বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাই। তিনিই নেপথ্যে থেকে এসব হয়রানিমূলক মামলা করাচ্ছেন৷ পুলিশই পারে তদন্ত করে তাঁকে খুঁজে বের করতে৷’
বার পরীক্ষায় বাধা: মামুন প্রথম আলোকে জানান, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। পরদিন তঁার বার কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্তির পরীক্ষা ছিল। তিনি ফার্মগেটে ভাইয়ের বাসায় বসে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাত ১০টার পর হঠাৎ কলবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে দেখেন পঁাচজন পুলিশ দাঁড়িয়ে৷ ‘মামুন কে?’ জানতে চায় তারা৷ মামুন পরিচয় দেন৷ পুলিশ জানায়, যৌতুকের একটি মামলায় তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে৷ মামুন পুলিশকে বলেন, ‘আমার বড় দুই ভাই এখনো বিয়ে করেনি৷ আমার তো বিয়ের প্রশ্নই আসে না। তার পরে তো যৌতুকের মামলা!’
কিন্তু পুলিশ মামুনকে শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে যায়। ‘পুলিশকে জানাই, পরদিন আমার পরীক্ষা। তখন পুলিশের একজন সদস্য আমাকে জানান, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাতে আপনি পরীক্ষা না দিতে পারেন। আমি কঁাদতে শুরু করি। থানার ওসিকে বারবার অনুরোধ করি, আমাকে যেন পরীক্ষাটা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু সারা দিন পার করে তারা সন্ধ্যায় আমাকে আদালতে নেয়৷ আদালত আমাকে জামিন দেন৷ ততক্ষণে পরীক্ষা শেষ৷’ এক নিঃশ্বাসে বলে যান মামুন৷
যৌতুকের ওই মামলার বাদী মোসাম্মৎ সূর্য বানু৷ ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরখানের। তিনি নিজেকে মামুনের স্ত্রী দাবি করে মামলা করেন। কিন্তু এলাকায় গিয়ে এজাহার অনুযায়ী ঠিকানা বা বাদী কিছুই পাওয়া যায়নি৷ মামলায় যে পাঁচজনকে সাক্ষী করা হয়েছে, তাঁদের কারও ঠিকানা দেওয়া হয়নি৷
ঢাকার বিচারিক হাকিম আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় ব্যবহার করা কাবিননামাটি ছিল ভুয়া৷ আদালত একাধিকবার বাদী ও সাক্ষীদের তলব করেছেন৷ কেউ আসেনি৷ ফলে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
আদালতে বাদীর পক্ষে মামলাটি করেছিলেন আইনজীবী মনিরুজ্জামান। তঁার ঠিকানাও দেওয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরখান। জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাছে সূর্য বানু ও তঁার ভাই পরিচয় দিয়ে একজন এসেছিল। তারা আমাকে যেভাবে বলে, আমি সেভাবে মামলাটি করি। তারা বলেছিল, যার বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, সেই মামুন গাড়িচালক। এখন তো মনে হচ্ছে আমি প্রতারিত হয়েছি।’
বিচারক নিয়োগ পরীক্ষা: গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সপ্তম জুডিশিয়ারির লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। ২৩ ডিসেম্বর ছিল মোখিক পরীক্ষা৷ ৮ জানুয়ারি মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় এবং মামুন তাতে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। মামুন বলেন, ‘ফল হওয়ার পর বাড়িতে গিয়ে জানতে পারি, ঢাকার উত্তরায় ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর একটি মামলার আসামি হিসেবে পুলিশ আমার খোঁজখবর করছে। ২২ ডিসেম্বর আমাকে ওই মামলার আসামি করা হয়। আমি তখন ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিমের কাছে যাই। তিনি বিষয়টি তদন্তে জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার সহকারী পুলিশ পরিদর্শক এস্কেন্দার আলীকে মামলার নথিপত্রসহ আদালতে হাজির হতে বলেন। মামলার নথিপত্র খুঁজে দেখা যায়, মামলার এজহারে আমার নাম নেই৷ কিন্তু এস্কেন্দার আলী আমার মৌখিক পরীক্ষার আগের দিন ২২ ডিসেম্বর এই মামলায় আমাকে আসামি দেখিয়ে কুমিল্লায় অনুসন্ধানপত্র পাঠিয়েছেন৷ কিন্তু আমার যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, সেটি ঠিক ছিল না বলে কুমিল্লার পুলিশ আমাকে তৎক্ষণাৎ খুঁজে পায়নি৷ নইলে আমার মৌখিক পরীক্ষাও দেওয়া হতো না।’
এস্কেন্দার আলী বর্তমানে উত্তরা পূর্ব থানা থেকে বদলি হয়ে দক্ষিণখান থানায় কর্মরত আছেন। জানতে চাইলে এস্কেন্দার আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই মামলার ১৫ নম্বর আসামি হিসেবে শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনের নাম ছিল। আমি তঁার ঠিকানা েখঁাজার চেষ্টা করি। তখন উত্তরখান থানায় আসা-যাওয়া করেন সাইদুল নামের একজন সাংবাদিক আমাকে কুমিল্লার মামুনের ঠিকানা দেন। এইটা আসলে ভুল হয়ে গেছে। আমি আদালতেও বলে এসেছি, আমার ভুল হয়েছে। সাংবাদিক সাইদুলের ফোন নম্বরও আমি আদালতকে দিয়ে এসেছি৷’
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইদুল নিজেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক বলে পরিচয় দেন৷ মুঠোফোনে সাইদুলের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
সহকারী জজ পদে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর পুলিশ ও একটি গোয়েন্দা সংস্থা মামুনের বিষয়ে পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তদন্ত শুরু করে৷ এ সময় দেখা যায়, এনএসআই, পুলিশের বিশেষ শাখা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় উড়ো চিঠি দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মামুনের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। এর সঙ্গে একটি ভুয়া কাবিননামা, ফেনী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এবং খুলনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মামলার কিছু কাগজপত্র দেওয়া হয়। এসব মামলায় মামুনের স্থায়ী ঠিকানা কখনো ফেনী, আবার কখনো খুলনা দেখানো হয়৷
মামুনের বিরুদ্ধে গত ১৬ মার্চ আরেকটি মামলা হয় মুন্সিগঞ্জে। ওই মামলায় মামুনকে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার কোলাপাড়া গ্রামের কুদ্দুসের দোকানের কর্মচারী বলা হয়েছে। মামলার আইনজীবী মুন্সিগঞ্জের সহকারী সরকারি কেঁৗসুলি (এপিপি) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।
জানতে চাইলে আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামুন বিচারক নাকি দোকান কর্মচারী, সেগুলো আমার কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। আমার কাছে একজন এসেছে এবং আমি আইনজীবী হিসেবে মামলা নিয়েছি। আসামি দোষী না নির্দোষ, সেগুলো আদালতেই প্রমািণত হবে। আর বাদী মিথ্যা মামলা করলে তঁার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারবেন আদালত।’
কুমিল্লার বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কাছে মামুনের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলার কাগজপত্র আসে। এরপর আমি নিজে মামুনের বিষয়ে তদন্ত করি। তঁার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হচ্ছে, সব ভুয়া। এলাকার নিরীহ ও শিক্ষিত পরিবার হিসেবে পরিচিত তাঁরা। আমি তদন্ত করে যা পেয়েছি, সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছি। এখন উল্টো আমাকেই উড়ো চিঠি দিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মামুনের এলাকার একটি প্রভাবশালী পরিবার, যাদের একজন সদস্য আইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তিনিই এসব হয়রানিমূলক মামলা করাচ্ছেন বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামুন আমাদের ছাত্র। আমি তার এই সমস্যা সমাধানে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের বিচারকদের সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তাঁদের বলেছি, কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা একটি ছেলের জীবন কারা নষ্ট করতে চাইছে, সেটা বের করা উচিত। যারা এ কাজ করছে, তারা বিভিন্ন সময়ে পুলিশকে ব্যবহার করছে। কারা এই মামলা করছে, সেটাও খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।’



