প্রথম আলোকে বললেন শিপন কুমার

Spread the love

আসলাম-মেন্দি বৈঠক হয়েছে, চক্রান্ত হয়নি

শরিফুল হাসান

ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির সদস্য মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরীর বৈঠক করিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের নাগরিক শিপন কুমার বসু। তবে ভারতের মাটিতে ওই বৈঠকে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন তিনি।
গতকাল ভারত থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটা দাবি করেন ‘হিন্দু স্ট্রাগল কমিটি বাংলাদেশ’-এর সভাপতি শিপন কুমার বসু। আসলাম চৌধুরীর জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চাইবেন বলেও জানিয়েছেন শিপন।
সাফাদি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনসের প্রধান মেন্দি এন সাফাদি। নয়াদিল্লিতে তাঁর সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আসলাম চৌধুরীর বৈঠকের খবর ও ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৬ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি পুলিশ রিমান্ডে আছেন। শিপন কুমারের ফেসবুকে গিয়ে দেখা গেছে, তিনি সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের নির্যাতন নিয়ে নানা সময়ে নানা ধরনের লেখা শেয়ার দিয়েছেন। এ ছাড়া ‘জেরুজালেম ইন মাই নেম’, ‘ইসরায়েল ইন মার্ট’ এসব গ্রুপের নানা পোস্ট শেয়ার দিয়েছেন। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে তিনি নিজেকে ‘ইন সার্চ অব রুটস’ নামের একটি সংগঠনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এ সংগঠনটি সাফাদি সেন্টারের সঙ্গে কাজ করে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গতকাল শিপনের ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে মেন্দি ও আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এরপর রাতে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন।
কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শিপন বাংলাদেশে মোসাদের এজেন্ট। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিপন বলেন, ‘আমি যদি কারও এজেন্ট হয়ে থাকি, সেটি আমার প্রিয় দেশ বাংলাদেশের ও আমার হিন্দু সম্প্রদায়ের। আমি হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন ও জমি দখলের বিরুদ্ধে কাজ করছি অনেক দিন ধরে। এর সূত্র ধরেই আমার সঙ্গে দুই বছর আগে মেন্দির যোগাযোগ হয়। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।’
এর আগে কখনো মেন্দির সঙ্গে দেখা হয়েছে কি না জানতে চাইলে শিপন বলেন, ‘এর আগে দিল্লি ও কলকাতায় দেখা হয়েছে। তেল আবিব ও দিল্লি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আমিও ভারতে যাওয়া-আসা করি হিন্দুদের অধিকার রক্ষায়। আমি যখন দেখলাম, মেন্দি একজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিক, তখন আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি, যাতে তিনি সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।’
আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ হলো, জানতে চাইলে শিপন কুমার বলেন, ‘তাঁর সঙ্গে আমার আগে কখনো দেখা হয়নি। চট্টগ্রামের হিন্দু নেতাদের কাছে আমি তাঁর সম্পর্কে জেনেছি। আমি এ বছরের ১ মার্চ ভারতে যাই। এর মধ্যেই জানতে পারি আসলাম চৌধুরী সেখানে এসেছেন। ফেসবুকে আমাদের যোগাযোগ হয়। মেন্দির সঙ্গে ভারতের বিজেপির নেতাদের বৈঠক ছিল। আমার বন্ধুরাই এই বৈঠকে ছিল। আমি তখন আসলাম চৌধুরীকে এই বৈঠকে নিয়ে যাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি ব্যবসায়িক আলাপ। কারণ, আসলাম চৌধুরী একজন বড় ব্যবসায়ী। বৈঠকে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পনা হয়নি।’
আসলাম চৌধুরী কি হিন্দুদের পাশে থাকেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শিপন কুমার বলেন, ‘তিনি সৎ লোক। ব্যবসায়ী। বিপদে আমার পাশে আছেন। কাজেই আমি তাঁর পাশে আছি।’ আসলাম চৌধুরীর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইবেন বলেও দাবি করেন শিপন কুমার।
শিপন বলেন, ‘মেন্দি সাফাদির সঙ্গে আমাদের বৈঠকে কোনো বাংলাদেশি সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন না। যেসব খবর বলা হচ্ছে, সেগুলো ঠিক নয়। কোনো ইসরায়েলি সংস্থার কাছ থেকে আমরা কোনো টাকা পাই না। বরং আমরা আমাদের কাজের জন্য তহবিল বাংলাদেশ থেকেই সংগ্রহ করি। অসাংবিধানিক কোনো উপায়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে উত্খাতের কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।’ কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফিরব।’
ফেসবুকে ‘মেন্দি এন সাফাদি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাট অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস’ নামের একটি পেজ রয়েছে। আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয় নিয়ে সেখানে যোগাযোগ করা হলে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এই পেজের সর্বশেষ পোস্টে খালেদা জিয়ার ছবিসহ জেরুজালেম অনলাইনের একটি পোস্ট রয়েছে, যার শিরোনাম ‘মাস ক্র্যাকডাউন অব বাংলাদেশি অপজিশন ফিগার’।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু ও মানবাধিকারকর্মীরা অব্যাহতভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং ক্ষমতাসীন সরকার আইএসকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় ওই নিবন্ধে। সেখানে সাফাদি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইসিসের (আইএস) মতো চিহ্নিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে যখন কোনো সরকার আশ্রয় দেয়, তখন তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবশ্যই কাজ করা উচিত এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জাতিগত নির্মূল করার প্রক্রিয়া থামানো উচিত।’
বিবিসি বাংলাকে গত সোমবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেন্দি বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি, সেখানে সংখ্যালঘুদের অবস্থা—এগুলো সবাই জানেন। আমরা দুজনে ভারতে সেসব নিয়েই কথা বলেছি, তা-ও একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে। আমরা দুজনে বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছিলাম বা সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিলাম—এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতেই পারে না।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার পর্যায়ের এক কর্মকর্তা গতকাল রাতে প্রথম আলোকে জানান, আসলাম চৌধুরীকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, এখনই তাঁরা গণমাধ্যমে কোনো নাম প্রকাশ করতে চান না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.