এ বছর সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী বিদেশ গেছেন

Spread the love

শরিফুল হাসান

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৭৬৯ জন নারী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। স্বাধীনতার পর এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। পুরুষের পাশাপাশি এই নারীরাও এখন গড়ছেন দেশের অর্থনীতি। নারীর ক্ষমতায়নেও এটি এক অগ্রযাত্রা।

সরকার বলছে, এখন আর নারী কর্মীদের বিদেশে যেতে কোনো খরচ হয় না। উল্টো নিয়োগকর্তারাই তাঁদের খরচ দিয়ে দেন। তবে এখনো মধ্যপ্রাচ্যে মাঝেমধ্যেই নারী নিগ্রহের খবর শোনা যায়। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা নারীদের বিদেশে কর্মসংস্থানকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বলছেন, নারীরা যদি বিদেশে যাওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ নেন এবং একটু সতর্ক ও সচেতন হন, তবেই ঝুঁকিগুলো এড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে দূতাবাস ও সরকারের নজরদারির কথাও বলছেন তাঁরা। গৃহকর্মীর পাশাপাশি নার্সসহ বিভিন্ন খাতে নারী কর্মী পাঠানোর সময় এসেছে বলেও মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশে নারীদের কর্মসংস্থান শুরু। অবশ্য ওই বছর মাত্র ২ হাজার ১৮৯ জন নারী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর ২০১৫ সালে গেছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮ জন কর্মী। চলতি বছর সেই সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে সরকার।

চলতি বছর সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। এই সংখ্যা ৬২ হাজার ৯১৬। অবশ্য সৌদি আরবেই নারী নিপীড়নের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ২০ হাজার ৭৬৩ জন জর্ডানে, ওমান ১১ হাজার ৮৭৫, কাতার ৫ হাজার ৭৩, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৪ হাজার ৭৪৫ এবং লেবাননে ২ হাজার ৩১৬ জন নারী কর্মী গেছেন।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫৬ জন নারী বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছেন। মূলত সৌদি আরব, আরব আমিরাত, লেবানন ও জর্ডানেই গেছেন তাঁরা। এর মধ্যে জর্ডান ও লেবাননে গার্মেন্টসে অনেক নারী কাজ করলেও বাকি দেশগুলোতে এখনো গৃহকর্মী হিসেবেই কাজ করছেন তাঁরা। ফলে এই নারী কর্মীরা ঝুঁকিতে থাকেন।

বাংলাদেশ মহিলা অভিবাসী শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়াকে আমরা খুবই ইতিবাচকভাবে দেখি। একজন প্রবাসী পুরুষ কর্মী অনেক সময় কিছু টাকা বিদেশে খরচ করে কিছু টাকা দেশে পাঠান। কিন্তু একজন নারী কর্মী প্রবাসে তাঁর আয়ের পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দেন। সংসার, সন্তান বা পরিজন ছেড়ে নারীরা এই যে বিদেশে থাকছেন, তাঁরা যখন নিপীড়নের শিকার হন, তখন বিষয়টি খুবই অমানবিক। সম্প্রতি সৌদি আরবে অনেক মেয়েই এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলে আমরা জেনেছি।’ সমস্যা সমাধানে কী করা উচিত, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি, বিদেশে যাওয়ার আগেই একজন নারীকে মুঠোফোন দেওয়া উচিত, যাতে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আর দূতাবাস থেকে নিয়মিত নজরদারি করা উচিত।’

বিএমইটির মহাপরিচালক সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারী অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা এখন বাড়ছে। সৌদি আরব, জর্ডান, লেবাননে আমাদের নারীরা যাচ্ছেন। কাতারও নারী কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আর এখন নারীদের বিদেশে যেতে কোনো খরচ হচ্ছে না। নিয়োগকর্তারাই টাকা দিয়ে দিচ্ছেন। কাজেই দালালদের কথা না শুনে যাঁরা বিদেশে যেতে চান, তাঁরা সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে বা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আর নারী কর্মীদের এখন আমরা যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাচ্ছি। ফলে তাঁরা দক্ষ হয়ে উঠছেন। ভবিষ্যতে গার্মেন্টস বা গৃহকর্মী কর্মী ছাড়াও অন্যান্য পেশায় আমরা নারী কর্মী পাঠাব।’

নারী কর্মীদের বিদেশে চাকরিসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য বিএমইটি ও ইউএন উইমেনের যৌথ উদ্যোগে বিএমইটি ভবনে ‘নারী অভিবাসী তথ্যকেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে গিয়েও রিক্রুটিং এজেন্সির খোঁজ, ভিসা পরীক্ষা এবং অন্য যেকোনো তথ্যের জন্য নারীরা যোগাযোগ করতে পারেন।

সাবেহা খাতুন ১৫ বছর ধরে কুয়েতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এক মাসের ছুটিতে আসেন দেশে। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, তাঁর ভাষায়, ‘সবার অভিজ্ঞতা একই রকম হয় না। আমার মালিক ভালো, তাই খুব একটা অসুবিধা হয়নি। কিন্তু অনেকের মালিক খারাপ থাকেন, তাঁদের কষ্ট খুবই। ভাগ্য ভালো আমার।’ 

Leave a Reply

Your email address will not be published.