বাহরাইনে নিহত ১৩ জনের লাশ দেশে

Spread the love

সেই বিমানবন্দর দিয়েই অন্য রকম ফেরা তাঁদের

শরিফুল হাসান

দরিদ্র শাহ আলম ভাগ্য ফেরানোর আশায় দুই ছেলেকে বাহরাইনে পাঠান। কিন্তু ভাগ্য ফেরার বদলে ছেলেরা ফিরেছেন লাশ হয়ে। গতকাল মঙ্গলবার বিমানবন্দরে দুই ছেলের লাশ নিতে এসে শোকে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কফিন বুঝিয়ে দেওয়ার সময় শুরু করেন অঝোরে কান্না। একসঙ্গে লাশ হয়ে ফেরা অন্যান্য হতভাগ্য প্রবাসী কর্মীর পরিবারের সদস্যদের অবস্থা ছিল কমবেশি শাহ আলমের মতোই। ১১ জানুয়ারি বাহরাইনের মুখারকা এলাকায় আগুনে পুড়ে ১৩ বাংলাদেশি মারা যান। গতকাল সন্ধ্যায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি বিমানে করে তাঁদের লাশগুলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। নিহত প্রবাসীরা হলেন, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর এলাকার ছগির আহমেদের ছেলে নাজির আহমেদ, পটিয়ার পাথুয়া গ্রামের রশিদ আহমেদের ছেলে মাহবুব আলম ও মারিয়াপাড়ার আবদুল আজিজের ছেলে মোহাম্মদ জামাল। নিহত ব্যক্তিদের পাঁঁচজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায়। তাঁরা হলেন, ওয়ালী গ্রামের আবু নাছের মিয়ার ছেলে জসিম, কাইতলার শহীদ মিয়ার ছেলে সাইফুল ইসলাম ওরফে সুজন ও স্বপন, গুড়িগ্রামের আবুল বাশারের ছেলে আনোয়ার হোসেন ও ভৈরবনগরের চাঁদ মিয়ার ছেলে জারু মিয়া। তিনজন চাঁদপুরের। তাঁরা হলেন: কচুয়ার নওয়াপাড়ার শাহ আলমের দুই ছেলে শাহাদাত হোসেন ও টিটু আহমেদ এবং মতলবের আবদুস সাত্তার খানের ছেলে শাহিন খান। বাকি দুজন হলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর কাশীপুর এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে ওসমান গনি এবং কুমিল্লার সদর দক্ষিণের জয়নাল আবেদিনের ছেলে মফিজুল ইসলাম।বিমানবন্দরের ৮ নম্বর কার্গো গেটের সামনে লাশের অপেক্ষায় ছিলেন শাহ আলম। শাহ আলম সেখানে প্রথম আলোকে জানান, তিনি পেশায় একজন শ্রমিক। ভাগ্য ফিরবে এমন আশায় ধারদেনা করে এক এক করে দুই ছেলে শাহাদাত ও টিটুকে বাহরাইনে পাঠান। ১১ জানুয়ারি শুক্রবার জুমার নামাজের পরও ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। এ সময় তাঁরা বাবাকে বলেন, ‘আমাদের কষ্ট আর থাকবে না।’ কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরেই আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় তাঁদের। একমাত্র ছেলে শাওনকে তিন মাস বয়সী রেখে বাহরাইনে যান কুমিল্লার মফিজুল। ছেলেকে নিয়ে বাকি জীবনটা কীভাবে পাড়ি দেবেন, সেই কথা বলতে বলতে কাঁদছিলেন তাঁর স্ত্রী হালিমা বেগম। শাহিন খানের সঙ্গে চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে আয়েশা বেগমের। এখনো কোনো সন্তান নেই। সংসার নিয়ে স্বামীর সঙ্গে অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন আয়েশা। এখন সবই স্মৃতি। জমি বিক্রি করে আর ঋণ নিয়ে ছোট দুই ভাই সাইফুল আর স্বপনকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন বড় ভাই সুমন মিয়া। এখনো চার লাখ টাকা দেনা। বাবা মোহাম্মদ জামালের লাশ নিতে এসেছিলেন ছেলে মামুনুর রশিদ। কাঁদতে কাঁদতে তিনি জানান, আট বছর আগে বাবা বিদেশে গিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন এবার একেবারে চলে আসবেন। সেই এলেন। তবে লাশ হয়ে। নিহতদের পরিবারের কষ্টের গল্পগুলো যেন একই। তাদের কী বলে সান্ত্বনা দেবেন, সেটি বুঝে উঠতে পারছিলেন না প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফও। নিহত ব্যক্তিদের প্রতিটি পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না এই ক্ষতি কী করে পূরণ হবে। তার পরেও শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর জন্য আমার সমবেদনা। আপনাদের পাশে আমরা থাকার চেষ্টা করব। প্রতিটি পরিবারকে আমরা দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেব।’ এ সময় কয়েকজন সাংসদ এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কার্গো গেটের সামনে মোনাজাতের পর প্রতিটি পরিবারকে লাশ বুঝিয়ে দেন বিএমইটির পরিচালক (কল্যাণ) মোহসিন চৌধুরী। একে একে লাশগুলো তোলা হয় আঞ্জুমান মুফিদুলের অ্যাম্বুলেন্সে। এরপর সেগুলো রওনা হয় গন্তব্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.