মালয়েশিয়ায় বৈধকরণ প্রক্রিয়া

Spread the love

অবৈধ বাংলাদেশিদের পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়বে

শরিফুল হাসান

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত যেসব অবৈধ বাংলাদেশির কাছে পাসপোর্ট নেই, কেবল তাঁদেরই নতুন করে পাসপোর্ট দেবে সরকার। আর যাঁদের পাসপোর্ট আছে, কিন্তু মেয়াদ নেই, তাঁদের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হবে। আর ‘সময়াভাবে’ এখন হাতে লেখা পাসপোর্ট দেওয়া হলেও ২০১৫ সালের মধ্যেই তা বদল করে এমআরপি (যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট) দেওয়া হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার লক্ষ্যে তাঁদের কী ধরনের পাসপোর্ট দেওয়া হবে এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক সভায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে মালয়েশিয়ায় তিন লাখ অবৈধ বাংলাদেশি আছে। সম্প্রতি এই অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়া। এ জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হবে। কিন্তু এই বাংলাদেশিদের অনেকের হাতেই পাসপোর্ট নেই। অনেকের পাসপোর্টের মেয়াদ নেই। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এ নিয়ে করণীয় কী, সে ব্যাপারে ঢাকার সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার প্রথমে সবাইকে এমআরপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু দেখা যায়, তিন মাসে তিন লাখ এমআরপি তৈরি করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ছাড়াও এতে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশির পাসপোর্ট বা কোনো রকম বৈধ তথ্য নেই, তাঁদের সবাইকে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাতে লেখা পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পাসপোর্ট ও বহির্গমন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, তাঁদের কাছে সব মিলিয়ে হাতে লেখা মাত্র চার লাখ পাসপোর্ট আছে। এ কারণে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ পাসপোর্ট বরাদ্দ দেওয়া যাবে। সভায় আপাতত এক লাখ হাতে লেখা পাসপোর্ট মালয়েশিয়ায় পাঠানো এবং পুরোনো পাসপোর্ট নবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। সভা সূত্রে জানা গেছে, যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট তৈরির প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে জানান, তিন মাসের মধ্যে তিন লাখ এমআরপি তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে এমআরপি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মালয়েশীয় সংস্থা আইআরআইএস জেভিকে এর দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতি কর্মীর জন্য ভ্যাটসহ খরচ পড়বে ৩০ ডলার (দুই হাজার ১০০ টাকার কিছু বেশি)। মালয়েশিয়া প্রবাসী প্রত্যেক অবৈধ কর্মীর কাছ থেকে ১০০ ডলার ফি নেওয়া হলে মোট ৩৫০ কোটি ডলার আয় হবে। ব্যয় হবে ৬৬ কোটি ডলার। তবে এককভাবে কাউকে কাজ দিতে গেলে বিভিন্ন জটিলতা হবে—এ অভিমত দিয়ে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ওই প্রবাসীদের দ্রুত হাতে লেখা পাসপোর্ট দেওয়ার পক্ষে মত দেন।এ বিষয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মালয়েশিয়ার অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার জন্য সরকার দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাজেই মালয়েশিয়া যখন এই সুযোগ দিচ্ছে তখন কোনোভাবেই সেটি হারালে চলবে না। আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক এমআরপি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই হাতে লেখা পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকের ব্যাপারে জানতে চাইলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণসচিব জাফর আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, মালয়েশিয়ার অবৈধ বাংলাদেশিদের মধ্যে পাসপোর্ট বা কোনো ধরনের ডকুমেন্ট নেই এমন লোকের সংখ্যা এক লাখের কম। তাঁদের জন্য হাতে লেখা এক লাখ নতুন পাসপোর্ট পাঠানো হবে। আর যাঁদের পুরোনো পাসপোর্ট আছে কিন্তু মেয়াদ নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাসপোর্ট নবায়ন করতে হবে। তবে সব পাসপোর্টেই ‘২০১৫ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে এমআরপি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হবে’ এই কথাটি লেখা থাকবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ করবে। সচিব বলেন, অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ২০১৫ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে হাতে লেখা সব পাসপোর্ট এমআরপি করা হবে। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ মে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার সিদ্ধান্ত হয়। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সিলর মন্টু কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, এর ফলে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশি শ্রমিকেরা বৈধভাবে এখানে থাকতে পারবেন। তিনি আরও জানান, জুন কিংবা জুলাইয়ে মালয়েশিয়া এ প্রক্রিয়া শুরু করবে।বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জনশক্তি বাজার মালয়েশিয়া ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশিদের কাজের অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ রেখেছে। এর ফলে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে ‘কলিং’ ভিসায় (চাহিদাপত্র অনুযায়ী ভিসা) যাওয়া বাংলাদেশিরা অবৈধ হয়ে পড়েন। কারণ তাঁরা তিন বছরের চুক্তিতে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ সালে দুই লাখ ৭৩ হাজার ২০১ জন এবং ২০০৮ সালে এক লাখ ৩১ হাজার ৭৬২ জন বাংলাদেশি কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.