স্বাস্থ্যসেবার নামে ১৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ!

Spread the love

শরিফুল হাসান


বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রায় ১৩ কোটি টাকা (প্রায় ১৯ লাখ ডলার) আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড। পদক্ষেপ মানবিক কেন্দ্র নামের ওই এনজিওর বিরুদ্ধে ভুয়া ব্যাংক হিসাব দেওয়া এবং কাগজপত্র জালিয়াতিরও অভিযোগ তোলা হয়েছে।গ্লোবাল ফান্ডের মহাপরিদশর্কের কার্যালয় (অফিস অব দি ইন্সপেক্টর জেনারেল—ওআইজি) দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দিয়ে পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ওআইজি। ৩২ পৃষ্ঠার এই তদন্ত প্রতিবেদন এখন গ্লোবাল ফান্ডের ওয়েবসাইটে।পদক্ষেপ মানবিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ইকবাল আহমেদ তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, গ্লোবাল ফান্ড থেকে দেওয়া অর্থ মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে লুটপাট করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন। এ অভিযোগ তোলার কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।তবে সেভ দ্য চিলড্রেনের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাইকেল ম্যাকগ্রাথ দাবি করেছেন, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হয়েছে।এনজিও খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের একটি এনজিওর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওয়েবসাইটে থাকায় সারা বিশ্বেই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া।যেভাবে অনিয়ম: এইচআইভি/এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকার ও এনজিওকে অর্থ দেয় গ্লোবাল ফান্ড। বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস নিয়ে কাজ করার জন্য গ্লোবাল ফান্ড থেকে মূল রিসিপেন্ট (পিআর) হিসেবে টাকা আসে সেভ দ্য চিলড্রেনের কাছে। এরপর সাব-রিসিপেন্ট (এসআর) হিসেবে সেই টাকা দেওয়া হয় পদক্ষেপকে।ওআইজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৬ লাখ ২৫ হাজার ৪২৮ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৫ কোটি টাকা) পেয়েছে পদক্ষেপ। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৯৪ হাজার ৪২৬ ডলার (প্রায় ১৩ কোটি টাকা), অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ অর্থই তছরুপ করা হয়েছে। আর এই অনিয়ম যেন ধরা না পড়ে, সে জন্য পদক্ষেপ ব্যাংক হিসাব জাল করেছে। এ ছাড়া, কেনাকাটার যেসব রসিদ তারা দেখিয়েছে, সেগুলোও জাল।পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রথম অভিযোগ ওঠে ২০০৯ সালের জুনে। এরপর তদন্ত শুরু করে সেভ দ্য চিলড্রেন। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত সেভ দ্য চিলড্রেন এই অনিয়মের নিরীক্ষা করে। তবে পদক্ষেপ সেটি ভিত্তিহীন বলে দাবি করে। ওআইজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর নিরীক্ষায় যখন অনিয়ম ধরা পড়ে, তখন বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালককে হুমকি দেয়।প্রতিবেদনে বলা হয়, সেভ দ্য চিলড্রেনের তদন্ত মানতে অস্বীকার করে গ্লোবাল ফান্ডকে বিষয়টি জানায় পদক্ষেপ। এরপর তৃতীয় একটি নিরীক্ষা ফার্ম দিয়ে তদন্ত করা হয় এবং তারাও অনিয়ম খুঁজে পায়। এ সময় পদক্ষেপ আবার ওই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। এরপর ২০১১ সালের মে মাসে গ্লোবাল ফান্ড নিরীক্ষা করতে এসে পদক্ষেপের সব ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত চেয়ে পাঠায়। কিন্তু তদন্তে নানাভাবে অসহযোগিতা করতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।প্রতিবেদনে বলা হয়, পদক্ষেপ তাদের আয়-ব্যয় হিসাবে ব্যাংকের যে বিবরণী দিয়েছে, সেটি জাল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, যে হিসাব দেখানো হয়েছে, সেটি তারা দেয়নি। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল হিসাব বিবরণী স্ক্যানের পর কম্পিউটারে কারসাজি করে সেটি জালিয়াতি করা হয়েছে।ওআইজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ব্যাংক হিসাবই জাল নয়, খরচের ভাউচার, বিলসহ যা যা সংযুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোও জাল। প্রতিষ্ঠানটি কেনাকাটার যে বিল দিয়েছে, অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, সেগুলোও ভুয়া।পদক্ষেপের অভিযোগ: পদক্ষেপের নির্বাহী পরিচালক ইকবাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের নামে ঘুষ চাইতেন সেভের কয়েকজন কর্মকর্তা। সেটি দিতে রাজি না হওয়ায় দেশি একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে তারা প্রথমে অনিয়মের অভিযোগ আনে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন চাওয়া হলে তারা সেটি দিতে রাজি হয়নি।’ইকবাল বলেন, ‘পরে যখন তারা ঘুষ পেল না, তখন থেকেই ষড়যন্ত্র করছে। এরই ধারাবাহিকতায় কোনো কারণ ছাড়াই ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুটি প্রকল্পের চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে সেভ দ্য চিলড্রেন।’সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে: সেভ দ্য চিলড্রেনের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাইকেল ম্যাকগ্রাথ এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, আন্তর্জাতিক সব নিয়ম মেনেই ওআইজি তদন্ত করে। সেই তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে পদক্ষেপ ১৯ লাখ ডলার তছরুপ করেছে। তারা যে ব্যাংক হিসাব দেখিয়েছে, সেটি জাল। কেনাকাটার যেসব কাগজপত্র দেখিয়েছে, ত-ও জাল। এই প্রক্রিয়ায় সেভ দ্য চিলড্রেনের কেউ জড়িত কি না, জানতে চাইলে ম্যকগ্রাথ বলেন, ‘আমরাই অনিয়ম ধরেছি। কাজেই এখানে সেভ দ্য চিলড্রেনের কারও জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না।’অন্যরা যা বলছেন: টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ওআইজির এই তদন্ত-প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওআইজি যে প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। তারা সবার সঙ্গে কথা বলেই এটি করেছে। আর সুস্পষ্টভাবেই তারা জালিয়াতির অভিযোগগুলো প্রমাণ করেছে।ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গ্লোবাল ফান্ড আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠান। তারা যখন বাংলাদেশের একটি এনজিওর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দেয়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। সরকারের উচিত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া।ওআইজি তাদের প্রতিবেদনে এই জালিয়াতির জন্য পদক্ষেপের কাছ থেকে ১৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া, এনজিওটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। জানতে চাইলে এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক নূরন্নবী তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এখনো কেউ এ ব্যাপারে কিছু জানায়নি। সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী আমরা যা করার করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.