মানব পাচার আইন জনশক্তি রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করবে

Spread the love

শরিফুল হাসান

প্রস্তাবিত মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের দুটি ধারার কারণে দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত চরম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিদেশে কাজের জন্য গিয়ে কেউ শোষণের শিকার হতে পারেন—এটা জেনেও এ কাজে সহায়তাকে মানব পাচারের সমতুল্য গণ্য করার যে বিধান উল্লিখিত খসড়া আইনে রয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, এর ফলে জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা এ ব্যবসায় নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অভিবাসন-প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। প্রস্তাবিত মানব পাচার আইনের ৩-এর (২) ধারায় আইনটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা ভূখণ্ডের বাইরে প্রতারণার মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যে অপর কোনো ব্যক্তিকে আইনি পন্থায় বা অন্যভাবে কাজের বা চাকরির উদ্দেশ্যে গমন, অভিবাসন বা বহির্গমন করতে প্রলুব্ধ বা সহায়তা করে, ইহা জানা সত্ত্বেও যে অপর ব্যক্তি আসলে বাধ্যতামূলক শ্রম বা সার্ভিচিউডের অনুরূপ শোষণমূলক শ্রম পরিস্থিতিতে অথবা এই ধারায় বর্ণিত কোনো প্রকার শোষণমূলক পরিস্থিতিতে নিপতিত হইবে, তাহা হইলে ওই ব্যক্তির ওই কাজ উপধারা (১)-এর সংজ্ঞায়িত মানব পাচার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।’এই ধারাটির সমালোচনা করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রস্তাবিত ৩-এর ২ অনুযায়ী বহির্গমন অধ্যাদেশ-১৯৮২-এর আওতায় সম্পাদিত অভিবাসন কার্যক্রমকেও মানব পাচার হিসেবে গণ্য করা যাবে। কারণ, কোনো ব্যক্তি বাধ্যতামূলক শ্রম বা অনুরূপ শোষণমূলক শ্রম পরিস্থিতিতে পড়তে পারে, সেটি জানা সত্ত্বেও তাঁকে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যেতে মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহায়তা করেন। বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি, প্রবাসী কর্মীদের সমস্যার সমাধানসহ সার্বিক প্রক্রিয়া ১৯৮২ সালের বহির্গমন অধ্যাদেশ অনুযায়ীই চলে।প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস-বায়রা উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় নিজেরাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৩ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত মানব পাচার আইনে বহির্গমন অধ্যাদেশের আওতাধীন কার্যক্রমকে কোনো রকম সুরক্ষাই দেওয়া হয়নি। বরং এর একটি উপধারায়-১৫ (৩)-বলা হয়েছে, এর অধীনে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না। মন্ত্রণালয় আশঙ্কা করছে, এর ফলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন অধিদপ্তর বা বিভিন্ন দূতাবাসের শ্রম শাখায় বা অন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিবাসন কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবেন। অতিরিক্ত সচিব এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিবাসন খাতের সচলতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে প্রস্তাবিত মানব পাচার প্রতিরোধ আইন চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বহির্গমন অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর আওতাধীন অভিবাসন কার্যক্রমকে ওই আইনের বাইরে রাখা উচিত। তা না হলে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সভাপতি আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানব পাচার আর জনশক্তি রপ্তানিকে এক করে ফেললে হবে না। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, নিয়মিত পন্থায়ও যদি কেউ বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়েন, তাহলে সেটি পাচার বলে গণ্য হবে। এটি হলে তো বিদেশে লোক পাঠানোই বন্ধ হয়ে যাবে। জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্বার্থরক্ষা হবে।’তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক) কামালউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় কিংবা বায়রা যে দাবি করছে সেটি মোটেও সঠিক নয়। মানব পাচার আইনের উদ্দেশ্য জনশক্তি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত নয়, বরং তাতে সহায়তা করা। মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো আইন না থাকায় যেসব দেশে লোক পাঠানো হয় তারা অনেক দিন ধরেই অসন্তুষ্ট ছিল। এর ফলে জনশক্তি রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা এ আইন পছন্দ করছে না। তারা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে খসড়া আইনের বিপক্ষে বোঝানোর চেষ্টা করছে।’কামালউদ্দিন আহমেদ জোর দিয়ে বলেন, এ আইনের ফলে অবৈধভাবে বিদেশে লোক পাঠানো বন্ধ হবে এবং সর্বোপরি নিরাপদ অভিবাসন-প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.