শরিফুল হাসান
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কেউ বিদেশে মারা গেলে তাঁদের মৃতদেহ দাফন, ক্ষতিপূরণ ও বিদেশে কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনাসহ প্রবাসীদের কল্যাণে গঠিত তহবিল থেকে ৩০০ কোটি টাকা নিতে চাইছে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক। এর ফলে প্রবাসীদের কল্যাণের কাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ব্যাংক বলছে, বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়ার মূলধন জোগাড় করতেই এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা অন্তত পাঁচটি বেসরকারি সংস্থা এবং বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এই টাকার পুরোটাই প্রবাসীদের দেওয়া কল্যাণের টাকা। বোর্ড শুধু এটি রক্ষণাবেক্ষণ করে। কাজেই প্রবাসীদের টাকা এভাবে ব্যাংককে দেওয়া বেআইনি।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও কল্যাণ তহবিলের ৯৫ কোটি টাকা ব্যাংককে দেওয়া হয়। তার বিপরীতে গত তিন বছরে ব্যাংক মাত্র দুই কোটি টাকা লাভ দিয়েছে কল্যাণ তহবিলে। অথচ কোনো ব্যাংকে এই টাকা জমা রাখলেও ৪৫ কোটি টাকা লাভ আসত। এখন ৩০০ কোটি টাকা দিলে একইভাবে আরও কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।
প্রবাসী ও বিদেশগামীদের আর্থিক সহায়তা দিতে ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে সরকার। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক আইন, ২০১০ অনুযায়ী, ব্যাংকের মোট মূলধন ৫০০ কোটি টাকা। আর অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা। অনুমোদিত মূলধনের পাঁচ কোটি টাকা সরকার এবং বাকি ৯৫ কোটি টাকা প্রবাসীকল্যাণ তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। অতিরিক্ত মূলধন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। কিন্তু প্রবাসীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ না করে আবারও কল্যাণ তহবিল থেকেই ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে যাওয়ার আগে একজন প্রবাসীকল্যাণ ফি বাবদ তহবিলে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা জমা দিয়ে যান। এভাবে প্রতিবছর তহবিলে গড়ে দেড় শ কোটি টাকা জমা হয়। সেই টাকার দেখভাল করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে বোর্ডের ৫৮০ কোটি টাকা জমা রয়েছে, যেখান থেকে বছরে ৫০ কোটি টাকা সুদ আসে।
তহবিলের টাকায় প্রবাসীদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তিসহ বিদেশে বসবাসকালে কেউ মারা গেলে কিংবা অসুস্থ হলে ওই প্রবাসীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
বেসরকারি সংস্থা ও কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দরিদ্র বিদেশগামীদের টাকা প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকে দিলে তাতে প্রবাসীদের কোনো উপকার হবে না। উল্টো তহবিল থেকে ব্যাংককে টাকা দিয়ে দিলে তাতে প্রবাসীদের কল্যাণে বিমা চালু, সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণসহ যেসব পরিকল্পনা গ্রহণের কথা সেগুলোর বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
তবে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজী মোহাম্মদ জুলহাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংক করা হবে। এ জন্যই ৩০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। বোর্ড টাকা দিতে রাজিও হয়েছে।’ আইন অনুযায়ী সেটি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় আইনকানুন উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। আমরা সেটি করছি।’
জানতে চাইলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘প্রবাসীরা কল্যাণ তহবিলে টাকা রেখে যান তাঁদের কল্যাণের জন্য। এখন সরকার যদি চায় তাহলে তো আমাদের টাকা দিতে হবে। তবে আমরা এমনভাবে দিতে চাই, যাতে করে ব্যাংক বোর্ডকে লাভ দেয়।’



