শরিফুল হাসান
বাংলাদেশে প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী থাকে। কিন্তু ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো প্রবাসী-আয় কমেছে। স্বাধীনতার পর গত ৪২ বছরে প্রবাসী-আয় কমার নজির এটাই প্রথম।
২০১২ সালের তুলনায় গত বছর প্রবাসী-আয় কমেছে সাত হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। গত বছর জনশক্তি রপ্তানিও আগের বছরের তুলনায় দুই লাখ কম হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রবাসী-আয় কমার কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নানা মত রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো গত বছর দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবকে প্রধান কারণ বলে মনে করছে। পাশাপাশি যেসব দেশে বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি করে, সেসব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিরও প্রভাব ছিল। এর সঙ্গে আছে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষক এবং এ খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, জনশক্তি রপ্তানি কম হওয়া প্রবাসী-আয় কমার একটি বড় কারণ। তবে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযানকেও অনেকে দায়ী করেছেন।
অবশ্য এসব মতের সঙ্গে মোটেই একমত নন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জনশক্তি রপ্তানি কমার সঙ্গে প্রবাসী-আয় কমার কোনো সম্পর্ক নেই, বরং অর্থনৈতিক মন্দা, যথাযথ বেতন না পাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি সুবিধার আশায় অনেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোয় সরকারি হিসাবে প্রবাসী-আয় কমেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে আমরা চিঠি দিয়ে বলেছি, যারা রেমিট্যান্স পাঠায় তাদের সামান্য হলেও সুবিধা দিন। তাহলেই রেমিট্যান্স পাঠানোর হার বেড়ে যাবে।’
অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর ধরেই বলছিলাম, প্রবাসী-আয় কমবে। কারণ, জনশক্তি রপ্তানি কমলে প্রবাসী-আয় কমবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এর পাশাপাশি সরকারি ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি, সব জায়গা থেকে টাকা পাঠানোর সমান সুযোগ না থাকাও প্রবাসী-আয় কমার জন্য দায়ী।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ৯০ হাজার ২৪০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ২০১২ সালে এক লাখ ১৫ হাজার ৮১৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকার প্রবাসী-আয় এসেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে প্রবাসী-আয় কমে হয় এক লাখ আট হাজার ১১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন এবং ২০১২ সালে ছয় লাখ সাত হাজার ৭৯৮ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় চার লাখ নয় হাজার ২৫৩ জনে।
আবার ২০১৩ সালে জনশক্তি রপ্তানি কমলেও বিদেশ প্রত্যাগতদের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১২ সালে ১৮ হাজার ৩৮৯ জন কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসেছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালে ফেরত আসার সংখ্যা ৩৭ হাজার ৪৮০ জন। এখনো মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে অবৈধ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
পেছনের কারণ: সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, নতুন অবকাঠামো নির্মাণকে কেন্দ্র করে জনশক্তি রপ্তানির মূল বাজার মধ্যপ্রাচ্যে সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। কাতার ও বাহরাইনে জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও সৌদি আরব ও কুয়েতের বন্ধ বাজার চালু করতে পারেনি বাংলাদেশ।
আট বছর ধরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম বাজার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে আড়াই লাখ করে কর্মী গেছেন দেশটিতে। কিন্তু গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয় দেশটি। এরপর নভেম্বরে সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতায় ‘ওয়ার্ল্ড এক্সপো ২০২০’-কে সামনে রেখে রাশিয়াকে সমর্থন দেয় বাংলাদেশ। এতে ক্ষুদ্ধ হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধই আছে। ২০১৩ সালে মাত্র ১৪ হাজার ২৪১ জন কর্মী গেছেন দেশটিতে।
গত বছরের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে সরকারের যেমন উদ্যোগের ঘাটতি ছিল, তেমনি অস্থিতিশীলতার কারণে আস্থাহীনতাও কাজ করেছে। ২০১৩ সালের আগে সৌদি আরবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে ফলপ্রসূ কোনো আলোচনা হয়নি। জাল ভিসা, যুদ্ধাবস্থাসহ নানা কারণে বাংলাদেশের আরেকটি বিকল্প বাজার হয়ে ওঠা লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিও বন্ধের পথে।
কুয়েতে শ্রমবাজার ২০০৯ সাল থেকেই বন্ধ। গত পাঁচ বছরে মাত্র ৯৫ জন লোক কুয়েতে গেছেন। এ সমস্যা সমাধানে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুয়েত সফর করেন। এরপর আর কোনো অব্যাহত কূটনৈতিক যোগাযোগ না থাকায় ওই বাজার আর চালু হয়নি।
২০০৭ ও ২০০৮ সালেও মালয়েশিয়ায় চার লাখ করে আট লাখ কর্মী গেছেন। কিন্তু প্রতারণাসহ নানা অনিয়মের কারণে ২০০৯ সালের মার্চে এসে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ২০১২ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া প্রতি মাসে ১০ হাজার করে কর্মী নেবে। বছরে তারা লাখ খানেক কর্মী নেবে। আগামী কয়েক বছরে পাঁচ লাখ কর্মী যাবে সরকারিভাবে। কিন্তু গত এক বছরে মাত্র দুই হাজার কর্মী গেছেন মালয়েশিয়ায়। এখন দেশটিতে অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে ১৬টি দেশের তালিকা করা হয়। এ দেশগুলো হলো: জাপান, হংকং, তাইওয়ান, ইতালি, বেলজিয়াম, জার্মানি, স্পেন, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা ও জিম্বাবুয়ে। এই দেশগুলোর পরিস্থিতি দেখতে প্রবাসী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে পাঁচটি দলও গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা অনেক দেশ সফর করলেও সেই অর্থে কোনো বাজার চালু করতে পারেননি।
জনশক্তি রপ্তানি খাতের ব্যবসায়ীরা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই মন্ত্রীকে দায়ী করে আসছিলেন। তাঁরা বলছেন, সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো প্রচলিত শ্রমবাজারগুলো সেভাবে চালু হয়নি। এর মধ্যে আরব আমিরাতের বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে ‘লাখ লাখ কর্মী যাবেন শোনা গেলেও’ এক বছরে মাত্র দুই হাজার কর্মী গেছেন। এর মধ্যে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীর দ্বন্দ্ব বেড়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি প্রবাসী-আয় কমার কারণ ভিন্নভাবে দেখি। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় এখন অবৈধদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। বৈধ হওয়ার জন্য অনেকের অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই টাকা হাতছাড়া করতে চাইছে না। প্রবাসী-আয় কমার এগুলোই প্রধান কারণ।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মাহফুজুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, কেবল পারিবারিক কাজ নয়, বিনিয়োগের জন্যও অনেক প্রবাসী-আয় আসে। কিন্তু গত বছরের শেষের দিকে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেকেই বিনিয়োগের জন্য টাকা পাঠাননি।



