সাংসদের আত্মীয়রাই মেয়র প্রার্থী
শরিফুল হাসান
নির্বাচন হচ্ছে পৌরসভায়। কিন্তু এ যেন সাংসদদের পছন্দ-অপছন্দের লড়াই। ফলে নারায়ণগঞ্জের দুটি পৌরসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে পুরো জেলার রাজনীতি। এমনকি দুই পৌরসভার প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে পুরো জেলার রাজনীতির হিসাব-নিকাশ।
নারায়ণগঞ্জের দুটি পৌরসভায় এবার নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে তারাব পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ গাজী গোলাম দস্তগীরের স্ত্রী হাসিনা গাজী। আর সোনারগাঁ পৌরসভায় দলের মনোনয়ন পাওয়া ফজলে রাব্বী নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ নজরুল ইসলামের বোনজামাই।
সোনারগাঁর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী সাংসদ শামীম ওসমানের প্রার্থী ছিলেন বর্তমান পৌর মেয়র সাদেকুর রহমান। কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে ফজলে রাব্বীকে মনোনয়ন দেওয়ায় পুরো জেলার আওয়ামী লীগের রাজনীতির নতুন হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে। কারণ, ফজলে রাব্বী কখনো আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গসংগঠনের কোনো পদে না থাকলেও কেবল সাংসদের আত্মীয়তার সুবাদে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের সাবেক সাংসদ আবদুল্লাহ আল কায়সারও তাঁর পক্ষে ছিলেন।
সাদেকুর ২০১০ সালে নাগরিক কমিটির ব্যানারে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে স্থানীয় বিএনপি ওই নির্বাচনে তাঁকে সমর্থন দেয়। এবার তিনি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। গত ১৭ অক্টোবর সোনারগাঁয়ের আমিনপুর মাঠে সভা করে শামীম ওসমান সাদেকুরকে সমর্থনের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন।
স্থানীয় লোকজন জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা আওয়ামী লীগ দুভাগে বিভক্ত। এক পক্ষে আছেন সাবেক সাংসদ আবদুল্লাহ আল কায়সার। সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ হোসেনসহ দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশই তাঁর সঙ্গে আছেন।
অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালাম শামীম ওসমানপন্থী হিসেবে পরিচিত। তাঁরা সবাই ভেবেছিলেন, শামীম ওসমান যেহেতু সাদেকুর রহমানের পক্ষে আছেন, কাজেই তিনিই মনোনয়ন পাবেন। তৃণমূল থেকে তাঁরা সাদেকুরের নামই কেন্দ্রে পাঠান। অন্যদিকে কায়সার সমর্থকেরা ফজলে রাব্বীর নাম পাঠান। শেষ পর্যন্ত ফজলে রাব্বী মনোনয়ন পাওয়ায় শামীম ওসমানপন্থীদের পরাজয় হলো বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেলেও সাদেকুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান কী হবে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে অবস্থান যা-ই থাক না কেন, এখন দল যাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে, আমরা তাঁর পক্ষে কাজ করব। তবে কারও স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা নেই।’
ফজলে রাব্বী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকেই দলের মনোনয়ন চেয়েছিল। কিন্তু যেহেতু শেষ পর্যন্ত আমিই মনোনয়ন পেয়েছি, আমি আশা করছি দলের সব নেতা-কর্মী আমার পক্ষেই কাজ করবেন। অনেকে আমার কাছে এসে সেই আশ্বাসও দিয়ে গেছেন।’
অন্যদিকে সাদেকুর রহমান বলছেন, এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। কাজেই তিনি নির্বাচন করবেন।
সোনারগাঁয়ে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন। তবে এখানে বিএনপির কোনো তৎপরতা নেই।
তারাব পৌরসভা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী জানান, এখানে রাজনীতির পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে গাজী পরিবার। উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও কেউ মনোনয়নপত্র নেওয়ার সাহস করেননি। বিশেষ করে থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শওকত আলী মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। দলের নেতাদের নামও জানিয়েছিলাম। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে আমার নামটিই তাঁরা কেন্দ্রে পাঠাননি।’ এখন কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নেত্রী ও দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তার পক্ষেই কাজ করব।’
সাংসদ নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, যে প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি আমার আত্মীয় হিসেবে পাননি। দল যোগ্যতা বিচার করেই তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের তারাবর বর্তমান পৌর মেয়র শফিকুল ইসলাম পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তবে বিএনপি ওই পৌরসভায় এবার মনোনয়ন দিয়েছে নাসিরউদ্দিনকে।



