জাপানে লোক পাঠানোর নামে চলছে প্রতারণা

Spread the love

শরিফুল হাসান

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা থেকে লোক নিয়ে তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ভাবছে জাপান। এ ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। কিন্তু এর আগেই জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জাপানে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণায় নেমেছে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (জিটকো) মাধ্যমে জাপানে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণায় নেমেছে ২৫টি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান (রিক্রুটিং এজেন্সি)।জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রা। এর সভাপতির প্রতিষ্ঠান সরকার রিক্রুটিং এজেন্সিও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। জিটকোর নীতিমালা অনুযায়ী জাপানে পাঠানোর জন্য কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া যাবে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো দেড় থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে। এক বছরে এভাবে অন্তত তিন হাজার লোকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও কেউ-ই জাপানে যেতে পারেননি।নীতিমালায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজনকে জাপানে পাঠানোর কথা থাকলেও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যার-তার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। এ জন্য সারা দেশে সক্রিয় আছে দালালেরা।কৃষিশ্রমিক ও শিল্পশ্রমিক হিসেবে জাপানে পাঠানোর কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টিকে প্রতারণা বলে অভিহিত করে সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।জিটকোর আওতায় বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষণার্থী পাঠানোর নীতিমালা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সরকার একটি কমিটি করে দিয়েছে। ওই কমিটির চেয়ারপারসন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বেগম শামসুন্নাহার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিটকোর আওতায় সাধারণ মানুষ নয়, শুধু প্রশিক্ষণার্থী শ্রমিক পাঠানো হবে। তবে এ জন্য কারও কাছ থেকে এক টাকা নেওয়ারও সুযোগ নেই। এমনকি তাদের ভাষা শেখার জন্যও টাকা না নিয়ে উল্টো টাকা দিতে হবে। কাজেই যারা এভাবে টাকা নিচ্ছে, তারা পুরোপুরি প্রতারণা করছে। সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। আর যারা টাকা নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।টাকা নিচ্ছে যারা: জাপানে যাওয়ার জন্য রেডিয়াস ইন্টারন্যাশনালের কাছে টাকা দিয়েছেন গাজীপুরের সাইফুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি দেড় লাখ টাকা দিয়েছি। আমাকে বলা হয়েছে, কৃষিশ্রমিক হিসেবে পাঠানো হবে। ছয় মাস ক্লাস করে ভাষা শিখলাম। কিন্তু টাকা দেওয়ার আট মাস হলেও জাপানে যাওয়ার খবর নেই।’ নাজমুল ইসলামের বাড়ি টাঙ্গাইল। তাঁর কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছে রেডিয়াস ইন্টারন্যাশনাল। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের আরিফুলের কাছ থেকে একই প্রতিষ্ঠান নিয়েছে দেড় লাখ টাকা। আরিফুল বলেন, ‘নভেম্বরে টাকা দিছিলাম। টাঙ্গাইলের আরও পাঁচজনকে আমি চিনি, যারা রেডিয়াসে টাকা দিয়েছে।’ কার মাধ্যমে টাকা দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকার দালাল নাছির তাঁকে ঢাকায় রেডিয়াসের কাছে নিয়ে গেছেন।রেডিয়াস ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, টাকা নেওয়ার বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান গোলাম আহমেদ শামীমের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন। যোগাযোগ করা হলে শামীম বলেন, তাঁরা কারও কাছ থেকে টাকা নেননি। টাকা নেওয়ার প্রমাণ আছে এমন বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘হয়তো আমাদের নাম ভাঙিয়ে দালালেরা টাকা নিচ্ছে।’ টাকা নেওয়ার নিয়ম আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি, সরকার আমাদের এক লাখ ৬০ হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ ঠিক করে দিয়েছে। সে টাকা তো আমরা নিতেই পারি।’জানা গেছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতির প্রতিষ্ঠান সরকার রিক্রুটিং এজেন্সিকে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন অনেকে। টাঙ্গাইলের বারেক মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করি। সরকার রিক্রুটিং এজেন্সি আমাকে জাপানে পাঠানোর কথা বলে জানুয়ারিতে এক লাখ টাকা নেয়। কিন্তু এখনো পাঠাচ্ছে না।’ একইভাবে প্রতারণার কথা জানিয়েছেন সজীব মিয়া ও ফেনীর বেলায়েত হোসেন।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বায়রার সভাপতি আবুল বাশার বলেন, ‘আমরা টাকা নিইনি। তবে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ ও থাকা-খাওয়ার জন্য একটা খরচ তো আছে। আমরা সেই খরচ নিয়েছি।’ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বাড়ি আবদুল মোমিনের। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে সর্বস্ব বিক্রি করে তিন লাখ টাকা দেন রিক্রুটিং এজেন্সি আর্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনালকে। প্রথম আলোকে তিনি জানান, দুই মাসের মধ্যে বিদেশে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ছয় মাস হয়ে গেলেও কোনো খবর নেই।কুমিল্লার কৃষিশ্রমিক আবুল কালাম জানান, এলাকার এক দালাল এসে তাঁকে জাপানে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এরপর তিনি ওই দালালের সঙ্গে ঢাকার মহাখালীতে আর্ডেন্টের অফিসে গিয়ে এক লাখ টাকা দেন। দালাল নেয় ৫০ হাজার টাকা। কথা ছিল দুই মাসের মধ্যেই জাপানে পাঠানো হবে। কিন্তু না পাঠিয়ে উল্টো আরও টাকা চাইছে।আর্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সরকার আমাদের জিটকোর মাধ্যমে জাপানে লোক পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে।’ কিন্তু সরকার কি কারও কাছ থেকে টাকা নিতে বলেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক বলেন, ‘সরকার তো কত নিয়মই করে দেয়। সরকার তো বলে সৌদি আরবে টাকা নেওয়া যাবে না। মালয়েশিয়ায় ৮৪ হাজার টাকা নিতে হবে। কে শুনে এগুলো। আমাদের খরচ আছে না। আর আমি একা না, বাকিরাও টাকা নিচ্ছে। তবে একবারে আমরা সব টাকা নিচ্ছি না।’আমির অ্যাভিয়েশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান এখনো জিটকোর অনুমতির কাগজ না পেলেও অন্তত দেড় শ লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তবে প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক আতাউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা জিটকোর অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু কারও কাছ থেকে টাকা নিইনি।’এছাড়া বে ইস্টার্ন রিক্রুটিং এজেন্সি, সানফ্লাওয়ার ট্রেডিং, গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ, এটলান্টা এন্টারপ্রাইজ ওভারসিজ লিমিটেড, অ্যারোমা ইন্টারন্যাশনাল, আল খামিছ ইন্টারন্যাশনাল, সাদমান ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানিস পাওয়ার করপোরেশন, প্রিমিয়ার কনসালটেন্টস, ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেডে, শাহীন ট্রাভেলস, মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, নাভিরা লিমিটেড, উইন ইন্টারন্যাশনাল, আমান এন্টারপ্রাইজ, দি হিউম্যান রিসোর্স বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, তাফা হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, মিতুল ট্রেডিং, জিহান ওভারসিজ এবং অ্যার অ্যান্ড আর ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি জিটকোর মাধ্যমে লোক পাঠানোর অনুমতি চেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে।সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বায়রার সভাপতি আবুল বাশার বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, ২৪টি রিক্রুটিং এজেন্সি জিটকোর মাধ্যমে লোক পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে দক্ষ লোক পাঠাতে হবে।’ এ জন্য কোনো টাকা নেওয়ার কথা কি না, জানতে চাইলে বায়রার সভাপতি বলেন, ‘কোনো টাকা নেওয়ার কথা না।’ তাহলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো টাকা নিচ্ছে কেন? আবুল বাশার বলেন, ‘সার্ভিসচার্জ হিসেবে কেউ কেউ টাকা নিতে পারে। যারা এত কষ্ট করছে তাদের তো কিছু লাভ থাকতে হবে। মন্ত্রণালয়ের উচিত, এ ব্যাপারে একটি খরচ নির্ধারণ করে দেওয়া।নারীদের সঙ্গেও প্রতারণা: শুধু পুরুষ নয়, নারীদের কাছ থেকেও টাকা নিয়ে প্রতারণা করছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। তাদের জাপানে ভালো ভালো পোশাক কারখানায় চাকরি দেওয়ার লোভ দেখানো হচ্ছে।ঢাকার শেওড়াপাড়া এলাকায় থাকেন পোশাককর্মী পান্না আখতার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জাপানে পোশাক কারখানায় কাজ করার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি প্রথমে ২০ হাজার টাকা নেয়। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার কোনো নামগন্ধ নেই। এখন তাঁর কাছে আরও টাকা দাবি করা হচ্ছে।একইভাবে প্রতারণার কথা জানিয়েছেন রাশিদা আক্তার, শাহিনুর ও নাসিমা। তাঁরা জানান, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের ৪ নম্বর সড়কের একটি এনজিওতে সাক্ষাৎকারের আয়োজন চলে। এসব সাক্ষাৎকারকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য একজন জাপানি লোকও থাকেন। রেডিয়াস ইন্টারন্যাশনালের মালিক শামীমের ছোট ভাই মীর নঈমউদ্দিন এই সাক্ষাৎকারের আয়োজন করেন। তিনি এলপি ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে জড়িত। নঈমউদ্দিন এখন জাপানে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক পিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানটি জাপানে লোক পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে। তবে স্যারের অনুমতি ছাড়া তাঁর পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়।সরকারের বক্তব্য: ঢাকায় জাপানি দূতাবাসের একজন প্রথম সচিব প্রথম আলোকে বলেন, জিটকোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে জাপান যাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক কঠিন। এখানে অনৈতিকভাবে কারও যাওয়ার সুযোগ নেই। কাজেই সাধারণ মানুষ যাঁরা টাকা দিয়েছেন, তাঁরা সর্বস্বান্ত হবেন। জিটকো কমিটির সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ইফতেখার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জিটকোর আওতায় তিন বছরের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে লোক যাবেন। কিন্তু এখানে সাধারণ কোনো শ্রমিকের যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কেউ যদি জাপানে লোক পাঠানোর কথা বলে টাকা নিয়ে থাকে, সেটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।জিটকোর আরেক সদস্য এবং বিএমইটির পরিচালক (প্রশিক্ষণ) আহসান হাবিব জানান, ২০০৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে জিটকোর সমঝোতা হওয়ার পর মাত্র ১২ জন লোক জাপানে গেছে। কাজেই যে কারও জিটকোর মাধ্যমে জাপানে যাওয়ার সুযোগ নেই। সবার এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার।প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে দক্ষ কর্মী নেওয়ার জন্য ২০০৫ সালে জিটকোর সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রথম সমঝোতা স্মারক সই হয়। কিন্তু আগের চুক্তি অনুযায়ী লোক পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় ২০১০ সালের ২১ মার্চ নতুন স্মারক সই হয়। তবে এখনো এই চুক্তির আওতায় লোক পাঠানো শুরু হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে এখনো কিছু চূড়ান্তও হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.