খরচের টাকা তুলতেই হিমশিম

Spread the love

 শরিফুল হাসান

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বাড়ি আফজাল হোসেনের। গ্রামে ছোট একটা দোকান ও কিছু জমিজমা ছিল। দ্রুত ভাগ্য বদলে যাবে—দালালদের এমন আশ্বাসে সিদ্ধান্ত নেন, বিদেশে আসবেন। দুই লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে তিন বছর আগে চলে আসেন মালয়েশিয়ায়। এখন তাঁর উপলব্ধি, এত টাকা খরচ করে আসাই হয়েছে বড় ভুল। কারণ এত দিনেও ওই টাকা তুলতে পারেননি। এর চেয়ে ওই টাকা দিয়ে দেশে কিছু করলে বরং ভালো হতো।আফজাল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের মসজিদ জামেক এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। সেখানেই নিজের এই উপলব্ধি জানান তিনি। বললেন, এখানে কাজ করে তিন বছরেও যে খরচের টাকা উঠবে না, তা তাঁকে কেউ বোঝায়নি। দালালেরা বলেছিল, খরচের টাকা উঠে লাভও থাকবে। এখন দেশে ফিরতে চাইলেও ভিসার মেয়াদ না থাকায় সে পথও বন্ধ।কেবল আফজাল নন, গত এক সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় যে কজন প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁরা সবাই বলেছেন, জমি বিক্রি, ধার-দেনা করে এত টাকা দিয়ে বিদেশে আসা তাঁদের জীবনে বড় ভুল হয়েছে। ভেবেছিলেন, টাকা কামিয়ে সব ধার শোধ করবেন, আবার জমি কিনবেন, সংসারের টানাটানির অবসান ঘটাবেন। কিন্তু তিন-চার বছর এখানে কাজ করেও তাঁদের বেশির ভাগই আসার জন্য খরচ করা টাকাই তুলতে পারেননি। ফলে সুখের স্বপ্ন কেটে গিয়ে জেঁকে বসেছে হতাশা। অনেকে বেশি বেতন পাওয়ার আশায় কাজ নিচ্ছেন অন্য কোম্পানিতে। ফলে পাসপোর্ট-কাগজপত্র হারিয়ে তাঁরা অবৈধ হয়ে পড়ায় তাঁদের তাড়া করে পুলিশের ভয়। এর পরও তাঁরা খরচের টাকা ও লাভ তোলার জন্য অমানবিক পরিবেশে মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। আটকা পড়ছেন নানা সমস্যার বেড়াজালে।জানা যায়, এশিয়ায় বৃহত্তম অভিবাসী শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ মালয়েশিয়ায় এই মহাদেশের ১৬টি দেশের প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (চার থেকে সাত গুণ) অর্থ খরচ করে আসতে হয় বাংলাদেশি শ্রমিকদের। মালয়েশিয়ায় অভিবাসন নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয় স্তরে স্তরে দালালের কারণে।কুয়ালালামপুরের ব্রিকফিল্ড এলাকায় কথা হয় নরসিংদীর বেলাব উপজেলার শাহীন মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, জমিজমা বিক্রি করা আড়াই লাখ টাকা খরচ করে এসে লোহার কারখানায় কাজ পান চার মাস পর। কাজ করতে হয় সারা দিন। কখনো কখনো দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন একা একা কাঁদেন। খরচের টাকা না ওঠায় কান্না চেপে আবার কাজ করেন।ভাগ্য ফেরাতে ঋণ করে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে তিন বছর আগে আসা আরিফুর রহমানের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। গ্রামে কৃষিকাজ করা আরিফ এখানে আসবাবের দোকানে দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করেও ওই ঋণ শোধ করতে পারেননি এখনো। হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘কবে পারব, তাও জানি না।’ গত কয়েক দিনে প্রবাসী যে কজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁরা মালয়েশিয়ায় আসার জন্য দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা বলেছেন।অথচ কুয়ালালামপুরের ভারতীয় একটি রেস্টুরেন্টে বসে নেপালি শ্রমিক কুনাল আচারিয়া ও আভি সুবেদি তাঁদের আসার খরচ সম্পর্কে জানান, বাংলাদেশি টাকায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লেগেছে। এটিও মনে হয় বেশি।জানা যায়, মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার শ্রমিকদের আসতেও প্রায় একই রকম অর্থ লাগে। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকদের খরচ হয় এর অর্ধেক। আর কম্বোডিয়ার শ্রমিক আনতে হলে উল্টো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকেই এ জন্য অর্থ খরচ করতে হয়।এশীয় অঞ্চলের ১৮টি দেশের অভিবাসন ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা কারাম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক হারুন-আল রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, অন্যান্য দেশের শ্রমিকের চেয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের এখানে আসার জন্য তিন থেকে চার গুণ (দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা) অর্থ দিয়ে আসতে হয়। সরকারিভাবে ৮৪ হাজার টাকার কথা বলা হয়। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, উড়োজাহাজ ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলে একজনের ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা। বাকি টাকা নিচ্ছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় থাকা কয়েক ধাপের দালালেরা। এই দালালপ্রথা ভাঙতে হবে। না হলে এখানে আসা বাংলাদেশি শ্রমিকেরাও ঋণের বেড়াজাল থেকে বের হতে পারবেন না। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।খরচ কম হওয়ায় অনেক বাংলাদেশি খেতে আসেন কুয়ালালামপুরের কোতারিয়ার বাংলা মার্কেট এলাকায়। সেখানকার রাজধানী রেস্টুরেন্টের মালিক কাজী সালাউদ্দিন ২০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় আছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশি সব শ্রমিকের একই সমস্যা। মালয়েশিয়ায় আসার জন্য খরচ হওয়া টাকা তুলতেই তাঁদের অনেকের জীবন যায় যায়। অনেকের খাওয়ার টাকা থাকে না, অনেকে শুধু ডাল দিয়ে ভাত খান। ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো নির্ধারণ করা উচিত। নইলে এভাবে লোক পাঠিয়ে তাঁদের কষ্টের সাগরে ফেলার দরকার নেই।’মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার এ কে এম আতিকুর রহমান এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশিদের বর্তমান এত সমস্যার মূল কারণ, অন্য দেশের শ্রমিকদের চেয়ে অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ। কেউ দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে এলে তিনি তো সেই টাকা না তুলে যাবেন না। কাজেই ওই টাকা তুলতে তাঁকে অতিরিক্ত সময় থাকতে হয়। এতে তৈরি হয় নানা সমস্যা। এটি সমাধানের একমাত্র উপায় অভিবাসন খরচ কমানো।হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সেলর মন্টু কুমার বিশ্বাস বলেন, এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে বিদেশে আসতে ইচ্ছুক কর্মীদেরই। যে টাকা খরচ করে তাঁরা আসছেন, তা কাজ করে তুলতে পারবেন—এটি নিশ্চিত হয়েই তাঁদের বিদেশে আসা উচিত।হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) মাসুদুল হাসান বলেন, নেপালের একজন শ্রমিকের আসার খরচ কম হলেও বেতন বাংলাদেশি শ্রমিকের চেয়ে বেশি, দিনে ৩০ রিঙ্গিত (এক রিঙ্গিতের বিনিময় হার বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২২ টাকা)। বাংলাদেশিরা দিনে পান ১৮ রিঙ্গিত। এর কারণ বাংলাদেশিরা বেতন ও কাজ এসব সম্পর্কে সঠিক না জেনেই বিদেশে আসেন। এর ফলেই সব সমস্যা হয়। শ্রমিকদের খরচ উঠবে কি না সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, সরকারকেও অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনার ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.