সহিংসতা ছাড়াই কেন্দ্র দখল এরপর সিল মারার উৎসব
শরিফুল হাসান
কেন্দ্রের সামনে যাওয়ার পর কয়েকজন পোলিং এজেন্ট জানালেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাঁদের বের করে কেন্দ্র দখলে নিয়েছেন। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, কোনো ভোটার নেই। পুলিশের দুজন এবং কয়েকজন আনসার সদস্য অসহায় দাঁড়িয়ে আছেন। আর বুথের ভেতরে একের পর এক ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ফেলছেন এক তরুণ। এটি গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলার দূর্বাটি মদীনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের চিত্র। গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে ওই কেন্দ্রের এই দৃশ্য। বাকি এজেন্টরা নেই কেন জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেনের এজেন্ট দুলাল মিয়া বললেন, ‘কেউ যদি স্বেচ্ছায় চলে যায়, আমরা কী করব?’
হাতে কোনো ধরনের কালি না লাগিয়ে যে তরুণ একের পর সিল মারছিলেন, তাঁর কাছে নাম জানতে চাইলে বললেন মামুন। এভাবে সিল মারছেন কেন জানতে চাইলে একগাল হাসলেন। ওই কেন্দ্রের দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য হুমায়ুন বললেন, ‘আমাদের কাজ বাইরের নিরাপত্তা দেওয়া। বাইরে তো কোনো গন্ডগোল হচ্ছে না। আর ভেতরে কী হচ্ছে, তা দেখবেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।’ প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নারগিস সুলতানা বললেন, তাঁর কাছে কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি।
এর আগে বেলা দেড়টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া সিদ্দিক মিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পোলিং কর্মকর্তাকে জিমিঞ্চ করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেনের দোয়াত কলমের পক্ষে সিল মারা হচ্ছে। খবর পেয়ে র্যাব, বিজিবি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজিয়া রহমান ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এরশাদ উল্লাহকে জোর করে সিলমারা ব্যালটগুলো গণনার সময় বাতিলের নির্দেশ দেন। একইভাবে কেন্দ্র দখল করে সিল মারার ঘটনা দেখা গেছে কালিগঞ্জের জামালপুর কলেজ, নাগরানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেগম রাবেয়া আহমেদ উচ্চবিদ্যালয় ও বাহাদুরসাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে।
কালিগঞ্জের ৯০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে কমপক্ষে ৪০টি দখল করে আওয়ামী লীগ একই ধরনের কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মনির হোসেন। তিনি জানান, কেন্দ্র দখলের এসব ঘটনা তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানিয়েছেন। এরপর ইউএনও কয়েকটি কেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেটও পাঠিয়েছেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট চলে আসার পরে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ফজলুল হক জানান, দিনভর কেন্দ্র দখল করে ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের পক্ষে সিল মেরে নিয়েছে। প্রায় সব কেন্দ্রেই এ ঘটনা ঘটেছে।
এই দুই প্রার্থীরই অভিযোগ, সারা দিনই কালিগঞ্জে ছিলেন এলাকার সাংসদ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ। নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় পতাকা নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং পথে পথে নেতা-কর্মীদের উৎসাহ দিয়েছেন। তবে মেহের আফরোজ এই অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ভোট দিতে এলাকায় এসেছেন এবং ভোট দিয়েই চলে গেছেন। জাতীয় পতাকা নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় ঘোরা আচরণবিধি লঙ্ঘন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একজন মন্ত্রী। আমার গাড়িতে তো পতাকা থাকবেই।’
কেন্দ্র দখল করে সিল মারার একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরের আরেক উপজেলা শ্রীপুরেও। এখানকার কাওরাইদের ত্রিমোহনী বুজুর ঢালী ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল ছাড়া ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে সিল মেরে বাক্সে ফেলেছেন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। সকাল ১০টার দিকে মাওনার আক্তাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আবদুল জলিলের আনারস প্রতীকে প্রকাশ্যে ভোট দেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এ সময় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী আবদুল মোতালেবের এজেন্ট লাবলুকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। আবদুল মোতালেব জানান, শ্রীপুরের ১২৬টির মধ্যে কমপক্ষে ৫০টি কেন্দ্রের এজেন্ট বের করে দিয়ে জোর করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে সিল মারা হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহনওয়াজ দিলরুবা বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের সহিংসতা হয়নি। সরকারদলীয় কর্মীদের কেন্দ্র দখল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ করেনি।



