বিচার চেয়ে হুমকিতে দুই পরিবার
শরিফুল হাসান

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার জলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন হওয়ার পরপরই খুন হন যুবলীগের কর্মী জসীমউদ্দিন হাওলাদার ওরফে পলাশ (৩৫)। এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও জলাবাড়ি ইউপির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আশিস কুমার বড়াল এখন কারাগারে।
গত ১৬ এপ্রিল সকালে পিটিয়ে হাত–পা ভেঙে দুই পায়ে রড বিদ্ধ করে জসীমউদ্দিনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহত জসীমের ছোট ভাই আলাউদ্দিন হাওলাদার আশিস বড়ালকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তবে ওই মামলা তুলে নিতে তাঁদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আলাউদ্দিন।
একই ধরনের অবস্থায় আছেন নাজিরপুর উপজেলার শেখমাটিয়া ইউনিয়নের শামসুল হকের (২৮) স্বজনেরাও। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৮ মার্চ রাতে উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, মামলা তদন্তে পুলিশের আগ্রহ নেই।
গত ২২ মার্চ এই দুই ইউপিতে নির্বাচন হয়েছিল।
শিশুসন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্ত্রী: নেছারাবাদের দুর্গাকাঠি গ্রামে জসীমউদ্দিনের বাড়ি। জলাবাড়ি ইউনিয়ন থেকে কাদামাটির রাস্তা পেরিয়ে বৃহস্পতিবার ওই বাড়িতে গিয়ে কথা হয় পরিবারটির সঙ্গে। জসীমউদ্দিনের বাবা আমির হোসেন হাওলাদার ছেলের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। পাশে ছিল জসীমের শিশুসন্তান শাফি।
জসীমের স্ত্রী নাসরিন বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর শিশুসন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। বিচার কী চাইবেন, উল্টো তাঁদেরই এখন হুমকি দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি আশিস বড়াল ও সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম দুজনেই জলাবাড়ি ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান। কিন্তু মনোনয়ন পান আশিস বড়াল। তখন তৌহিদুল জাতীয় পার্টিতে (জেপি) যোগ দিয়ে নির্বাচন করেন। জসীম তাঁর পক্ষে কাজ করেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন আশিস বড়াল।

আলাউদ্দিন হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, ‘১৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে নয়টার আশিস বড়ালের নির্দেশে তাঁর লোকজন জসীমকে পিটিয়ে ডান পা ও বাঁ হাত ভেঙে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। কেন এই হত্যাকাণ্ড—জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি। এরপর হত্যা। কিন্তু এখন মামলা তুলে নিতে হুমকি ও চাপ দেওয়া হচ্ছে।
তবে আশিস বড়ালের স্ত্রী শিবানী বড়াল দাবি করেছেন, তাঁর স্বামীকে ষড়যন্ত্র করে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। প্রতিপক্ষের লোকেরা এই কাজ করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, জসীম হত্যা মামলায় ২৭ এপ্রিল হাইকোর্ট থেকে চার সপ্তাহের জামিন পান আশিস বড়াল। এরপর ২৬ মে আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
নেছারাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। প্রধান আসামি আশিস বড়ালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তিন মাসেও হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার হয়নি: নাজিরপুরের শেখমাটিয়া ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৮ মার্চ রাতে উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুল হককে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শামসুলের বাড়ি চর রঘুনাথপুর গ্রামে। পিরোজপুর থেকে নাজিরপুর সদরের চঠইমহল থেকে সড়কপথে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলে করে গতকাল এই গ্রামে যাওয়ার পথে কথা হয় চালক জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শামসুলের মতো বিনয়ী হাসিখুশি ছেলেকে এভাবে কুপিয়ে হত্যা মানা যায় না।’
এ ঘটনায় শামসুলের বড় ভাই মনজুরুল হক রঘুনাথপুর গ্রামের যুবলীগ কর্মী মোয়াজ্জেম শিকদারকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। এতে শেখমাটিয়া ইউপিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী এস এম কাইয়ুম উজ জামানসহ ৪৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখমাটিয়া ইউপি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলামের ভাগনে শামসুল হক। ৮ মার্চ রাতে শামসুল হক ও শেখমাটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন মোটরসাইকেলে করে তৌহিদুলকে বাড়ি পৌঁছে ফেরার পথে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইউম উজ জামানের লোকজন রড দিয়ে পিটিয়ে ও রামদা দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে জখম করেন। ওই দিনই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামসুল মারা যান।
শামসুল হকের বাবা আবদুল বারী গতকাল বলেন, ‘মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ তিনি বলেন, মামলা করায় তাঁর আরেক ছেলে মনজুরুলকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে না। আহত জাহাঙ্গীর হোসেন অভিযোগ করেন, আসামিরা বিভিন্ন সময়ে তাঁকেও হুমকি দিয়ে বলছে, একটা হত্যার যে বিচার দুইটা হত্যারও সেই বিচার। কাজেই এই মামলায় তিনি যেন কোনো সাক্ষ্য না দেন।
হত্যার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কাইউম উজ জামান গতকাল দাবি করেন, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই মামলায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।
নাজিরপুর থানার ওসি নাছিরউদ্দিন মল্লিক বলেন, পুলিশ মামলার দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল। এখন সিআইডি মামলাটি তদন্ত করছে।



