আঙিনায় আশ্রয় নিলেন তারেক

Spread the love

শরিফুল হাসান 


ঢাকা-মাওয়া-কাওরাকান্দি হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রাম। চেনা পথ। এই পথেই অসংখ্যবার ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছেন তারেক মাসুদ। গতকাল বুধবারও এই পথেই ঢাকা থেকে মা, ভাইবোন, স্বজনদের সঙ্গে বাড়ি ফিরলেন। পার্থক্য শুধু—তিনি বেঁচে নেই; ফিরেছেন লাশ হয়ে।নানা রকম ফুলগাছের সন্নিবেশের জন্য বাড়ির উঠানটা খুব পছন্দ ছিল তারেকের। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদও তাই ঠিক করলেন, এই উঠানের এক পাশেই দাফন করবেন প্রিয় তারেককে। হলোও তাই। গতকাল বেলা পৌনে তিনটায় বাড়ির উঠানের এক পাশে দাফন করা হলো প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদকে।এর আগে দুপুরে ঢাকা থেকে তারেকের মরদেহ ভাঙ্গা পাইলট হাইস্কুল মাঠে আনা হলে সেখানে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেঁদেছে উপস্থিত গ্রামবাসীও।স্কুলমাঠে ভাঙ্গা উপজেলাসহ ফরিদপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী এই চলচ্চিত্রকারকে শ্রদ্ধা জানান। বেলা দুইটায় এখানে তাঁর জানাজা হয়।ঢাকা থেকে ভাঙ্গা—মায়ের কান্না: সকাল সাতটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমাগার থেকে তারেকের লাশ নিয়ে ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা হন স্বজন ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। পথে বেইলি রোড থেকে গাড়িতে ওঠেন স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ।সকাল থেকে বৃষ্টি। এই বৃষ্টিভেজা পথেই মানিকগঞ্জে দুর্ঘটনা। এই বৃষ্টিভেজা পথেই বাড়ি ফেরা। সকাল ১০টায় তারেক মাসুদকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি মাওয়া ঘাট থেকে ফেরিতে ওঠে পদ্মা পার হওয়ার জন্য। ফেরিতে তারেকের মা নূরুন নাহার মাসুদ যে মাইক্রোবাসটিতে বসে ছিলেন, তার ঠিক পেছনেই ছিল তারেককে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি। তসবিহ তিলাওয়াত করতে করতে বৃদ্ধ মা বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন, যেন ফিরে তাকালেই দেখতে পাবেন আদরের বড় ছেলে তারেককে।ফেরিতে কথা হয় নূরুন নাহারের সঙ্গে। বললেন, ‘আমার সাত ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে তারেকের জন্য আমার অন্য রকম টান। ওরও আমার প্রতি তেমন টান। কিসে আমার কষ্ট হবে, কিসে ভালো হবে—সব সময় খেয়াল রাখত। পৃথিবীর যে দেশেই থাকুক, নিয়ম করে আমাকে ফোন করত। আমার রান্না খুব পছন্দ করত। বাড়িতে আসবে শুনলেই আমি ওর জন্য রান্না করতাম। দিন দশেক আগে ওর বাবা মারা গেল। ও আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “মা, আল্লাহর যখন যাকে ইচ্ছা, নিয়ে যান। এ ক্ষেত্রে বয়সে ছোট না বড়, দেখেন না।” তখন আমি ওকে বলি, বাবা রে, আমি আগে মরি। তার পরে তুই মরিস। কিন্তু ও আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল।’শেষ বিদায়: ভাঙ্গা চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে কালো কাপড়ের অনেক ব্যানার। তারেক মাসুদকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের শোকবার্তা। পুরো ভাঙ্গাই যেন তারেকের শোকে কাঁদছে।দুপুর ১২টায় তারেক মাসুদের মরদেহ পাইলট হাইস্কুল মাঠে নেওয়া হলে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসে সর্বস্তরের মানুষ। মানুষের এই ঢল থামাতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সবাই একবার ছুঁয়ে দেখতে চায় তারেকের কফিন।স্থানীয় সাংসদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, জেলা ও থানা আওয়ামী লীগ, থানা বিএনপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ভাঙ্গা পৌর মেয়র, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ফরিদপুর সাহিত্য সংসদ, ভাঙ্গা থিয়েটার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ, সমতা থিয়েটারসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তারেক মাসুদকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান। ঢাকা থেকে আসা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ, নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম, নাট্যব্যক্তিত্ব শিমূল ইউসুফ, রোকেয়া প্রাচী, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবিরসহ অনেকেই এ সময় উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসাদের সবাই সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারকে আহ্বান জানান।জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় স্কুলের পাশেই নূরপুর গ্রমে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে দাফন করার কথা থাকলেও স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের ইচ্ছায় বাড়ির পূর্ব পাশের আঙিনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।তারেক মাসুদকে সমাহিত করার পর বেশ কিছুক্ষণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন ক্যাথরিন মাসুদ। কিছুটা সময় কবরের মাটি ছুঁয়ে ছিলেন। যেন পরম মমতায় স্বামীকে শেষবারের মতো ভালোবাসা জানালেন।ছুটে এসেছিলেন মইফুল বিবি: তারেক মাসুদের লাশ দেখতে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শহীদ নগর থেকে ছুটে এসেছিলেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মইফুল বিবি। তিনি একাত্তরে শহীদ এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু তিনি এখানে এসেছেন। তারেকের কবরের এক পাশে নীরবে কাঁদছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘তারেককে আমি পেটে ধরিনি। কিন্তু ও আমার ছেলে। আমার ছেলে কেন এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে গেল?’এই মইফুল বিবির কথা তারেক মাসুদ তুলে ধরেছিলেন মুক্তির কথা চলচ্চিত্রে। মইফুল বিবি ওই চলচ্চিত্রে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘একাত্তরে আমার স্বামী মইরা গেছিল। কই, শেখের বেটি তো আমারে কোনো দিন দেখতে আইল না।’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের পর শেখ হাসিনা মইফুল বিবিকে দেখতে এসেছিলেন।অপেক্ষায় এক কিশোরী: তারেক মাসুদের বাড়ির পাশেই লাবণ্য শিকদারের বাড়ি। কাজী শামসুন্নেসা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। তারেক চাচার লাশ দেখতে সকাল থেকে বাড়ির উঠানে বসে আছে মেয়েটি। লাবণ্য জানাল, ‘তারেক কাকা বাচ্চাদের খুব পছন্দ করতেন। বাড়িতে এলে আমাদের সঙ্গে গল্প করতেন। সর্বশেষ দাদা (তারেক মাসুদের বাবা) মারা যাওয়ার পর যখন বাড়িতে এসেছিলেন, তখন আমাকে বাড়ির একটি মুরগি দেখিয়ে বলেন, ধরতে পারলে পুরস্কার পাবি। কাকা তো আর কোনো দিন আসবেন না? কে আমাদের সঙ্গে এখন দুষ্টুমি করবে?’সবার বিপদে: প্রতিবেশীরা জানালেন, এলাকার কারও কোনো বিপদ-আপদ হলে খোঁজ পেলেই তারেক মাসুদ তাঁকে সহায়তা করতেন। এলাকার মানুষের সবার কথা, বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না তারেক মাসুদের।তারেক মাসুদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ভ্যানচালক দেলোয়ার হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘তারেক ভাই এলাকার সবার বিপদে সাহায্য করতেন। আমার দেড় বছরের মেয়ে লামিয়া অসুস্থ ছিল। তারেক ভাই জানতে পেরে চিকিৎসার জন্য আমাকে তিন হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এখন তিনিই তো চলে গেলেন।’ ভাঙ্গা উপজেলার চেয়ারম্যান সুধীন কুমার সরকার বলেন, ‘তারেক ভাই মানুষের কথা সব সময় বলতেন। সবার বিপদে সাহায্য করতেন। কিন্তু সবই গোপনে। দেশের প্রতি এত টান ছিল যেই মানুষটার, তাকে তো আমরা ধরে রাখতে পারলাম না।’ চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী: ফরিদপুরের মৃণাল সেন চলচ্চিত্র সংসদের আহ্বায়ক সালামত হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারেক ভাইয়ের আগ্রহেই আমরা ফরিদপুরে মৃণাল সেন চলচ্চিত্র সংসদ গঠন করি। সারা দেশে যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি ওঠে, তখন তাঁর পরামর্শে আমরা মুক্তির গানসহ মুক্তিযুদ্ধের অনেক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করি। তিনি সব সময় যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলতেন।’কাগজের ফুল নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন গুণী এই নির্মাতা। এ জন্য লোকেশন দেখতে ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে যান তিনি। সেখান থেকে ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন প্রাণ হারান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.