শরিফুল হাসান
১০০ যুবকের সব পুঁজি ও স্বপ্ন নিয়ে প্রতারণা করেছে আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। রুমানিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে এসব যুবকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে তাঁদের নিঃস্ব করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাঁরা টাকা ফেরত পেতে তিন বছর ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। প্রতারিত ব্যক্তিদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনালকে ওই যুবকদের ২১ জনকে ২২ লাখ ১৬ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। সেই টাকাও পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) এ-সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে এবং প্রতারিতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব ইউরোপের দেশ রুমানিয়ায় দক্ষ পুরুষ কর্মী পাঠানোর কথা বলে ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনাল। তারা ১০০ জনকে পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর পদে রুমানিয়া পাঠানোর জন্য বাছাই এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নামের তালিকা প্রকাশ করে। কথা ছিল, টাকা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে বিদেশে পাঠানো হবে। দক্ষতাভেদে কর্মীদের বেতন হবে মাসে ৩০০ থেকে ৫৫০ মার্কিন ডলার (২২ থেকে ৪০ হাজার টাকা)। প্রতারিতদের মধ্যে নুরুল আলম, আলমগীর হোসেন, পুলক কান্তি দাশ, কলিমুদ্দিন, ফজলুর রহমানসহ আরও কয়েকজন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছ থেকে জনপ্রতি দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অনেকে আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনালের কার্যালয়ে টাকা দেন। আবার কারও কারও কাছ থেকে আরামবাগের ইউরোপা ফ্যাশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব এবং চট্টগ্রামে ইউরোপার প্রতিনিধি সোহরাব হোসেনের ব্যাংক হিসাবেও টাকা জমা নেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন তাঁদের ঘোরানো হয়। শেষ পর্যন্ত আর বিদেশে যেতে না পেরে প্রতারিত ব্যক্তিরা সবাই বিএমইটিতে অভিযোগ করেন। কিন্তু বিএমইটিতে মামলা টেকে মাত্র ২১ জনের। অন্যদের টাকা নিয়ে রসিদ দেওয়া হয়নি। রসিদ না থাকায় তাঁদের মামলা টেকেনি। নওগাঁর কলিমুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সর্বস্ব বিক্রি করে টাকা দিছিলাম। আজ পথে পথে ঘুরছি। দুই লাখ টাকার রায় পাইছি। কিন্তু টাকা পাইনি। কোনো দিন পাব কি না, তা-ও জানি না।’ বিএমইটি সূত্র জানায়, যে ২১ জনের মামলা টিকেছে, তাঁদের মোট ২২ লাখ ১৬ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনালকে নির্দেশ দেয় বিএমইটি। এই টাকাও পরিশোধ করেনি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি। এরপর চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স (লাইসেন্স নম্বর ২৪৮) ও জামানত বাজেয়াপ্ত করে সরকার। কিন্তু জামানত হলো মাত্র ছয় লাখ টাকা। প্রতারিতদের অভিযোগ, এই ছয় লাখ টাকা রক্ষা করতেও প্রতিষ্ঠানটি তৎপরতা চালাচ্ছে।প্রতারিতদের মধ্যে চট্টগ্রামের নূর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন বছর ধরে পথে পথে ঘুরছি। বিএমইটি বলছিল ১০ দিনের মধ্যে টাকা পাব। কিন্তু তা আর পাচ্ছি না। এভাবে আর কত দিন?’ পুলক কান্তি দাশ বলেন, রুমানিয়া যেতে তিনি সোয়া দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু আল-আব্বাস তাঁকে রসিদ দেয় এক লাখ টাকার। তাই বিএমইটি তাঁর পক্ষে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দেয়। তিনি প্রথমে সেটা মানেননি। আবার আবেদন করেন। বছর খানেক ঘোরানোর পর মন্ত্রণালয় আবার এক লাখ টাকার রায় দেয়। কিন্তু সেই টাকাও পাননি। তিনি বলেন, ‘অনেকবার মন্ত্রণালয়ে গেছি। আল-আব্বাসের মালিক মজিবুর রহমান মুরাদকেও দেখছি মন্ত্রণালয়ে ঘুরছে। আমি মন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি টাকা ফেরত পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধ করতে করতেই আমাদের জীবন শেষ।’একই হতাশার কথা জানালেন প্রতারিত মুক্তার হোসেন, ফজলুর রহমান, আলমগীর হোসেন, আসাব আলী, ফজলুর রহমান। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: জানতে চাইলে আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনালের মালিক মজিবুর রহমান প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন, রুমানিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ‘৬০০ লোককে পাঠিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভিসা পাওয়ার পরও শ খানেক লোক পাঠাতে পারিনি। এঁদের মধ্যে যাঁরা ব্যাংকের মাধ্যমে আমাদের কাছে টাকা দিয়েছেন, তাঁদের টাকা পর্যায়ক্রমে আমরা ফেরত দিচ্ছি।’ বেশির ভাগ লোকই তো টাকা ফেরত পাননি বলে অভিযোগ করেছেন, এর জবাবে মজিবুর রহমান বলেন, ‘এখন সময় খারাপ। আমাদের ব্যবসা নেই। তাই টাকা দিতে পারছি না। আর সরকার আমার লাইসেন্স বাতিল করছে। কাজেই এখন এটা সরকারের দায়িত্ব।’ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ শাফায়েত হোসেন রুমানিয়ার প্রতারিতদের অভিযোগ তদন্ত করে রায় দিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আল-আব্বাস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এখন জামানতের টাকা ক্ষতিগ্রস্তরা অনুপাত হারে পাবেন।’ মাত্র ছয় লাখ টাকা জামানত রেখে এত বড় প্রতারণার বিরুদ্ধে এই শাস্তি কি যথেষ্ট, এ প্রশ্নের জবাবে শাফায়েত হোসেন বলেন, ‘আগে ছয় লাখ টাকা জামানত দিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো লাইসেন্স পেত। এ ক্ষেত্রে আমাদের আইনের বাইরে গিয়ে করার কিছু নেই।’ তিনি বলেন, যেহেতু প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণিত, তাই ক্ষতিগ্রস্তরা চাইলে এখন ফৌজদারি মামলা করতে পারেন।



