স্বজনহারা বা আহতদের এই কান্না শুনতে চাই না

Spread the love

18/8/20

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পর্বতারোহী ও স্কুলশিক্ষক রেশমা নাহারের সাইকেলকে কোন গাড়িটি ধাক্কা দিয়েছিল, ৩৮২টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে সেটি খুঁজে বের করেছে পুলিশ। মাইক্রোবাসটির জব্দ করার পাশাপাশি চালককেও আটক করা হয়েছে।

৭ আগস্ট ঢাকার চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশে লেক রোডে সাইকেল আরোহী রেশমা নাহারকে একটি মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয়। পুলিশ বলছে, ঘটনার পর ৩৮২টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ১০ থেকে ১২টি সিসি ক্যামেরা থেকে ধাক্কা দেওয়া গাড়ির ছবি পাওয়া যায়। পরে পুলিশ গ্যারেজে গ্যারেজে গিয়ে নজরদারি করে চারটা গাড়িকে চিহ্নিত করে এবং ধাক্কা দেওয়া গাড়িটি জব্দ ও চালককে আটক করে।

অনেকবার লিখেছি, বলেছি, সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের অভিশাপ। তবে মাঝে মধ্যেই দেখি যেভাবেই দুর্ঘটনাই ঘটুক কিছু লোক চালককে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করে। হ্যা এটাও আমি বিশ্বাস করি সব ঘটনায় চালক সমান দায়ী নয়। কিন্তু যে ঘটনায় চালক ঘুমিয়ে পড়ে, পাঁচ জায়গায় ধাক্কা দেয়, পাগলের মতো গাড়ি চালায়, ভুয়া লাইসেন্স নেয় সেগুলোও কী অপরাধ নয়? কিন্তু কোন চালকের কবে শাস্তি হয়েছে? এই যে আজকেও ময়মনসিংহে চালক ঘুমাচ্ছিল, মাইক্রোবাস নিয়ে পুকুরে চলে গেল, আটজন মানুষ মরে গেল এর দায় কার?

হ্যা মানছি, সড়ক দুর্ঘটনার আরও কিছু কারণ আছে। কিন্তু এমন একটি ঘটনাও পাওয়া যাবে না যেখানে চালকের কোন ভূমিকা নেই। বরং প্রতিটা দুর্ঘটনায় চালক কোন না কোন ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু তারপরেও চালক বা পরিবহন মালিক বা নেতাদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা চলে। আর চালক বাদেও যে আরও দশটা সমস্যা আছে সেগুলোর সমাধানেই বা আমরা কী করছি? আর গাড়ি চালানো তো কোন খারাপ পেশা নয়। বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ পেশা। সেটাকে ঠিক করার জন্য আমরা কী করেছি?

রেশমার ফেসবুকে কাভারে যান। একটা মেয়ে দূর পবর্তের দিকে চেয়ে আছে। সেই মেয়েটা এখন নেই। আচ্ছা এই ঢাকা শহরে বাইসাইকেলের জন্য কেন আমরা আলাদা লাইন করছি না? এই শহরের লোকেদের হাঁটতে দেবেন না, ফুটপাত নেই। একটা সাইকেল লেনও দেবেন না। গণপরিবহনে চড়া যাবে না। মানুষ যাবে কোথায়?

শুধু রেশমা কেন, সরকারি হিসাবে ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এক যুগে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৮ হাজার লোক। গত দশ বছরে যদি আরও ৩৮ হাজার ধরি তাহলে তো আশি হাজার হয়ে গেল। বেসরকারি হিসেবে নিশ্চয়ই লাখ পেরুবে। নিশ্চয়ই পঙ্গু হয়েছে আরও কয়েক লাখ।

যারা স্বজন হারায় বা আহত হয় তারাই এর যন্ত্রণা বোঝে। আমার মনে আছে আমাদের সঙ্গে স্কুলে জাহাঙ্গীর নামের যে ছেলেটা অসাধারণ ফুটবল খেলতো সড়ক দুর্ঘটনায় সেই পাটাই কেটে ফেলতে হয়েছে। এরকম কতো জাহাঙ্গীর যে আছে এই দেশে শেষ নেই।

এই যে রেশমা নামের মেয়েটা যে কী না পর্বত জয়ের মতো ভয়াবহ কঠিন কাজ করতে পারে তাকে কেন এই শহরের রাস্তায় মরতে হবে? পুলিশকে ধন্যবাদ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার জন্য। আমি মনে করি দেশের প্রতিটা সড়কে এভাবে সিসি ক্যামেরা বসালে হয়তো দায়ীদের চিহৃিত তরা যাবে। চালকদেরও নিশ্চয়ই প্রশিক্ষণ দরকার।

দেখেন ব্র্যাকের কয়েকশ গাড়ি সারাদেশে চলে। বাস-মাইেক্রাবাস-প্রাইভেটকার সব আছে। আমি নিজে আমাদের চালক ভাই আপাদের সঙ্গে সারাদেশ ঘুরেছি। আপনি বছরে সাধারণত একটা দুর্ঘটনার কথাও শুনবেন না। আমি নিজে বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়েছে প্রতিটা চালকের দারুণ প্রশিক্ষণ আছে। আর গাড়ির যে গতিসীমা বেঁধে দেওয়া আছে, যেটা ক্রস করলেই ট্রান্সপোর্ট বিভাগে অটো মেসেজ চলে যায়। এগুলো কিন্তু দারুণ কার্যকর উদ্যোগ।

কিন্তু বলেন তো রোজ সড়কে মানুষ মরতে হবে? আমি জানি না এসবের শেষ কোথায়? আমি মনে করি মালিক-চালক-সাধারণ জনগণ সবাই সচেতন হলে এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে, সব রাস্তায় সিসি ক্যামেরা থাকলে, প্রতিটা দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে দেখলে এবং আমরা সবাই মিলে কাজ করলে নিশ্চয়ই সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব। বিশ্বাস করে নিহত সন্তানের লাশ জড়িয়ে আছে স্বজনরা এই ছবিগুলো ভীষণ কষ্ট দেয়। আমি শুধু এই ছবিগুলো দেখতে চাই না। স্বজনহারা বা আহতদের এই কান্না শুনতে চাই না। বলেন এই চাওয়া কী খুব বেশি চাওয়া?

Leave a Reply

Your email address will not be published.