শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানেরা বললেন

Spread the love

রায়ে যন্ত্রণা কমেছে

শরিফুল হাসান

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা বাস্তবায়নকারী গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বহাল থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানেরা। তাঁরা বলেছেন, তাঁরা এমন রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের যন্ত্রণা অনেক কমেছে। এখন রায় কার্যকর দেখার অপেক্ষা।
গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখেন।
এ রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর বলেন, এ রায়ে একদিকে জাতির দায়মুক্তি হয়েছে, অন্যদিকে তা শহীদ পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার নিয়ে এসেছে। রায় কার্যকরের দিন অনেক বেশি ভালো লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও যারা জড়িত ছিল, যারা এখন বিদেশে পলাতক, তাদেরও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। প্রত্যেকের শাস্তি হোক।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী চিকিৎসক আলীম চৌধুরীর মেয়ে নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘নিজামী কোনো সাধারণ অপরাধী নন। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয়। এই বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার পূর্বপুরুষের রক্তের ঋণ শোধ করেছে। আর তাঁদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে বাংলাদেশকে যে অপমান করা হয়েছিল, সেটারও বদলা নেওয়া হলো। ভবিষ্যতের জন্যও এ রায় মাইলফলক।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী রাশিদুল হাসানের মেয়ে রোকাইয়া হাসিনা বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ রায়ের জন্য অপেক্ষা করেছি। বিশেষ করে বাবাসহ লাখো মুক্তিযোদ্ধার রক্তের বিনিময়ে আনা লাল-সবুজের পতাকা যখন নিজামীর গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া, তখন থেকে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘নিজামী সব সময় দম্ভোক্তি দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতেন। আজকে সমগ্র জাতি জানল, তিনি অপরাধী। এ রায় যখন কার্যকর হবে, তখন আরও ভালো লাগবে।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হানও রায় নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, নিজামী শুধু সাধারণ গণহত্যা নয়, বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়নে সরাসরি জড়িত। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন। আর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বুদ্ধিজীবীদের নিয়েই কটূক্তি করলেন। আজকের রায়ে প্রমাণিত, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করতে চাইছেন। কাজেই শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি চাই, মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন হোক।’ একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।
শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ বলেন, ‘এই বাংলাদেশে নিজামী-মুজাহিদরা যখন মন্ত্রী হয়েছিলেন, সেটা ছিল আমাদের জন্য গ্লানির। এ রায় একটা মাইলফলক। যাঁরা বলেন বুদ্ধিজীবীরা নির্বোধের মতো মারা গেছে, তাঁদের জন্য এটি চপেটাঘাত। আমার মনে হয়, মানবতাবিরোধীদের যেমন ফাঁসি হচ্ছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের ধারাবাহিক আন্দোলনে জামায়াত নিষিদ্ধ হবে, মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন হবে, যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি ক্রোক হবে।’
শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে তৌহীদ রেজা নূর বলেন, ‘সুপরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য আলবদর গঠিত হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন নিজামী। এর আগে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনাতেই বিজয়ের আগমুহূর্তে ঘাতকেরা বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই রাজাকারেরা ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। মন্ত্রীও হন। শহীদ পরিবারের জন্য এটি ছিল মারাত্মক যন্ত্রণার। আজকের রায়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবার সুবিচার পাচ্ছে। যে নরঘাতকেরা জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে এ রায় তাৎপর্যবাহী। আগামী প্রজন্মসহ সারা পৃথিবীর জন্য এ রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.