লোকমান হত্যা মামলা

Spread the love

আড়াই বছরেও বিচার শুরু হয়নি

শরিফুল হাসান 

লোকমান হত্যা মামলা
লোকমান হত্যা মামলা

নরসিংদীর জনপ্রিয় পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেতা লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শুরু হয়নি৷ আওয়ামী লীগের এক পক্ষের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুবিধা নিতে লোকমানের পরিবারই এই বিচার বিলম্বিত করছে৷
কিন্তু লোকমানের পরিবার বলছে, পুলিশ যে অভিযোগপত্র দিয়েছে, তাতে এজাহারভুক্ত ১১ আসামিই বাদ পড়েছে। তাই তারা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মাধ্যমে যথাযথ তদন্ত চায়। সেটি না হওয়ায় বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।
২০১১ সালের ১ নভেম্বর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমানকে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ ওই ঘটনায় তাঁর ভাই কামরুজ্জামান তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের ছোট ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এর মধ্যে এক আসামি মোবারক হোসেন বিদেশে পলাতক। বাকি ১৩ জনের সবাই গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন। পুলিশ প্রায় আট মাস তদন্ত করে ২০১২ সালের ২৪ জুন সালাহউদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত ১১ আসািমকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেয়। তাতে মামলার এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন ওরফে মোবা, এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসািম নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তাঁর ছোট ভাই শহর যুবলীগের সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগপত্রে আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু এই অভিযোগপত্রের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ২০১২ সালের ২৪ জুলাই নরসিংদীর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে নারাজি আবেদন করেন কামরুজ্জামান। আদালত পরদিন নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন৷ পরে ২৮ আগস্ট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন কামরুজ্জামান৷ আদালত ৪ নভেম্বর আপিল আবেদনও খারিজ করেন। এরপর হাইকোর্টে যান তিনি৷ হাইকোর্ট ওই অভিযোগপত্র বাতিল করলে সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানানো হয়৷ হাইকোর্ট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতে এ মামলার বিচারকাজ স্থগিত করেন। এর পর থেকেই আটকে আছে লোকমান হত্যার বিচার৷
লোকমান হত্যাকাণ্ডের পর জেলা আওয়ামী লীগও বিভক্ত হয়ে পড়েছে৷ নরসিংদী আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের অভিযোগ, লোকমান হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা পেতেই বিচার বিলম্বিত করছে তাঁর পরিবার। হত্যাকাণ্ডের পর পৌরসভার উপনির্বাচনে জনগণের সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন ভাই কামরুজ্জামান৷ একই সহানুভূতি কাজে লাগাতেই নরসিংদী সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছিলেন লোকমানের স্ত্রী তামান্না নুসরাত৷ আওয়ামী লীগও দলীয় সহানুভূতি দেখিয়ে তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল৷ তবে গত বছরের ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে পরাজিত হন নুসরাত৷
জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘সবাই জানে, লোকমানের সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল৷ অথচ তাঁর পরিবার আমার বিরুদ্ধে মামলা করল। কিন্তু পুলিশ তদন্ত করে আমার কোনো সম্পৃক্ততা পেল না। আমি চাই, এই হত্যা মামলার যথাযথ বিচার হোক। তাহলেই বেরিয়ে আসবে কারা খুনি। কিন্তু সেটি না করে লোকমানের পরিবার এই হত্যা নিয়ে রাজনীতি করছে।’
কেন এই বিচারকাজ আটকে আছে—জানতে চাইলে তামান্না নুসরাত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। মামলার বাদীকে জিজ্ঞাসা করুন।’ লোকমানের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করছেন, এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে আবেগ বেশি দিন কাজ করে না। বাস্তবতা মানতে হয়। আমিও সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েছি। আমি চাই লোকমান হত্যার বিচার হোক।’
মেয়র কামরুজ্জামান বলেন, ‘মামলার শুরু থেকে বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে, এখনো হচ্ছে। রিমান্ড শুনানির দিন আসামির জামিন হয়েছে। তড়িঘড়ি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আমরা যাদের আসামি করেছিলাম, তাদের প্রায় সবাইকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ৷ সে কারণেই আমরা উচ্চ আদালতে গেছি। এই হত্যা নিয়ে আমরা কোনো রাজনীতি কবছি না। আমরা চাই সুষ্ঠু বিচার।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.