মানবিক পৃথিবীতে তারুণ্যের জয় হোক

Spread the love

20/8/20

বাংলাদেশি যে কারও অর্জন আমাকে আনন্দিত করে। জাতিসংঘের বাস্তব জীবনের নায়ক বা রিয়েল লাইফ হিরো হিসেবে চার বাংলাদেশির স্বীকৃতির খবরটিও সেইরকম। এই চারজনের মধ্যে Tanbir Hasan Shaikat ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছোট ভাই৷ করোনাকালে ও যা করেছে সেটা আজীবন ভালোবাসা হয়ে থাকবে।

আপনারা সবাই জানেন, মার্চে বাংলাদেশে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজেদের বাড়িতে চলে গেলেও তানভীর ঢাকায় থেকে ক্যাম্পাসের প্রান্তিক মানুষদের টানা ১১৬ দিন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এখন তানভীর তিনি সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত মানুষকে সহায়তা করতে সেখানে আছেন।

ডাকসুর একজন সদস্য কিংবা ছাত্রলীগের একজন সদস্যের কেমন হওয়া উচিত সেটা তানভীরকে দেখে আমরা শিখতে পারি। তানভীর আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদেরও সদস্য। কাজেই ওর প্রতি ভালোবাসার শেষ নেই। অনেকবার ওকে এই ভালোবাসার কথা জানিয়েছি।

জাতিসংঘের ‘বাস্তব জীবনের নায়ক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আরেক তরুণ প্রকৌশলী Rizvi Hassan ব্র্যাকে আমার সহকর্মী। কখনো আলাদা করে তার সঙ্গে কথা বা আড্ডা হয়নি। আজই প্রথম ওকে শুভেচ্ছা জানালাম। তানভীরকে যেমন আমরা সবাই চিনি রিজভী তেমনি নিরবেই কাজ করে গেছে। আজ কয়েক মিনিট কথা বলে মনে হলো, নিরবে কাজ করতেই ও বেশি আনন্দ পায়।

রিজভী বুয়েট থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা শেষে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে কাজ শুরু করেন রিজভী৷ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের জন্য সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের কাজ পান৷ তিনি সেখানে কম খরচে নিরাপদ স্থাপনা গড়ে তোলা শুরু করেন৷ রোহিঙ্গা শিবিরের নারীদের কাউন্সেলিংসহ দক্ষতা উন্নয়নের নানা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এসব স্থাপনায়৷ ব্যতিক্রমী এসব স্থাপনার মাধ্যমে বহু নারীকে নিরাপদে সেবা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যেতে পারছে ব্র্যাক ও ইউনিসেফ।

স্বীকৃতি পাওয়া বাকি দুজন অনুবাদক সিফাত নূর ও তরুণী আঁখির সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। সিফাত সম্পর্কে জানলাম, বিভিন্ন জটিল, জীবনরক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন৷ ২০২০ সালের মার্চে ট্রান্সলেটর উইদাউট বর্ডারস নামের একটি সংস্থায় কাজ শুরুর পর ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি বিদেশি শব্দের বাংলা অনুবাদ করেছেন তিনি৷

আঁখির জীবনটা তো গল্পের মতো। বাংলাদেশের আরও বহু শিশুর মতো একসময় শিশুশ্রমে নিয়োজিত ছিলেন আঁখি৷ তাঁকে পুনর্বাসনে সহায়তা করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন৷ বয়সের কারণে স্কুলে ফেরানো না গেলেও তাঁকে সেলাইকাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷ পরে তাঁকে দেওয়া হয় একটি সেলাই মেশিন ও কিছু কাপড়৷ সেখান থেকে তিনি নিজের গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে থাকেন৷ বর্তমানে আঁখি তাঁর মা ও বড় বোনের সহযোগিতায় নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছেন৷

গল্পের পরের অংশটা দারুণ। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে মাস্ক-সংকট দেখা দেয়৷ আঁখি তখন মাস্ক তৈরি করতে শুরু করেন৷ কম দামে আশপাশের দরিদ্র মানুষের কাছে এসব মাস্ক বিক্রি শুরু করেন তিনি৷

এই চারজনের সঙ্গে তানিয়া আক্তারও স্বীকৃতি পেয়েছে। তানিয়া মিডওয়াইফারিকে’ (ধাত্রীবিদ্যা) পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন মানুষের সেবা করার জন্য৷ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত দ্বীপ ভোলায় তিনি মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং প্রসব-জটিলতার বেশ কিছু ঘটনা সামলেছেন৷ ২০১৭ সালের শুরু থেকেই তানিয়া রোহিঙ্গা মায়েদের সেবা দেন৷ সেখান থেকে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বদলি করা হয় তাকে। সেখানে গিয়েও দারুণ সেবা দিচ্ছেন। তাঁর কাছ থেকে সেবা নিতে রোগীর ভিড় লেগে থাকে৷ মিডওয়াইফারিকে বাংলাদেশে স্বতন্ত্র পেশা হিসেবে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখেন তানিয়া৷

আমি জানি না এই তরুণ-তরুণীদের গল্পগুলো আপনাদের কতোটা ছুঁয়েছে। আমাকে ভীষণ স্পর্শ করেছে। আমি যে বারবার বলি এই বাংলাদেশ নিয়ে আমার অনেক আশা তা তো এই তরুণদের কারণেই। স্বীকৃতি পাওয়া এই তরুণদের অভিনন্দন। তবে আমি জানি সারা বাংলাদেশে আরও অনেক তরুণ নানাভাবে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

আমি বিশ্বাস করি পুলিশ, প্রশাসন, সরকারি বেসকারি চাকুরি, স্বেচ্ছাসেবক, ছাত্র-ছাত্রী যে যেখানেই আছে ন্যায়ের পথে চলে আমাদের তরুণরা এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এগিয়ে নিয়ে যাবে মানবতাকে। গড়ে দেবে তারা নতুন এক মানবিক বাংলাদেশ। মানবিক পৃথিবী। তাই তো সবসময় বলি তারুণ্যের জয় হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.