শরিফুল হাসান
সকালে উঠে ফেসবুক ও পত্রিকায় ছবিটা দেখে দারুণ ভালো লাগলো। গুলশানের আগুন লাগা বহুতল ভবন থেকে আড়াই মাসের এই শিশুটিকে উদ্ধার করে আনছে ফায়ার সার্ভিস এক কর্মী। বাচ্চাটা ভবনের ১০ বা ১১ তলার কোনো একটা ফ্লোরে আটকা পড়েছিল।
ফায়ার সার্ভিস কর্মীটির মুখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন কী ভয়ানক কষ্ট করে উদ্ধার করেছেন তিনি বাচ্চাটিকে। আর বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকান, যেন পৃথিবীর মানুষের বিশেষ করে ফায়ার সার্ভিসের প্রতি সব ভালোবাসা তাঁর চোখেমুখে।
প্রথম আলোয় আমার সাবেক সহকর্মী আলোকচিত্রী সাজিদ ভাই ছবিটা তুলেছেন। শুধু এই শিশুটি নয়, দুই দশকের সাংবাদিকতা জীবনে রানা প্লাজায় ভবন ধ্বস, লঞ্চডুবি, তাজরীন গার্মেন্টস, নিমতলীর আগুনসহ অনকে ঘটনা সরাসরি কাভারে করেছি। বহু ঘটনার খবর পড়েছি। প্রতিটা ঘটনায় দেখেছি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসাধারণ কাজ করে। একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়!
২০১২ সালের মার্চ মাস। মেঘনায় এমভি শরীয়তপুর-১ নামে একটা লঞ্চডুবেছে। শত শত মানুষ নিখোঁজ। উদ্ধারকারী জাহাজে বসে মানুষের আহজারি দেখছি। প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে সেই আহাজারির খবর পত্রিকায় লিখে পাঠাচ্ছি। ঘটনার দুদিন পর স্বজনেরা জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে লাশের জন্য আহাজারি করছে।
এই বাহিনী সেই বাহিনীর দেশি বিদেশি ট্রেনিং পাওয়া নানা লোকজন আসছে আধুনিক সব সরঞ্জামন নিয়ে। তারা পানির নিচে যায়। কিন্তু খুব একটা লাশ উদ্ধার হয় না। সেই সময় হাজির হলেন শুকনো রুগ্ন লিকলিকে শরীরের ফায়ার সার্ভিসের এক ডুবুরি। একেকটা ডুব দেয়। দুইটা করে লাশ তোলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে একাই ৩০-৩৫ টা লাশ উদ্ধার করলেন। সব বাহিনীর সদস্যরা বিস্ময় নিয়ে তাকে দেখছে। বিস্মিত আমিও। শুকনো শরীরের লোকটার নাম আবুল খায়ের। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি। অসম্ভব সাহসী মানুষ। তাই তো প্রচণ্ড স্রোত বা যতো প্রতিকূল পরিস্থিতিই হোক, ডাক পড়ে আবুল খায়েরের। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতে চায়, আবুল খায়ের, তুমি কি যেতে পারবে?’ তার উত্তর, ‘পারব স্যার। কিন্তু ফিরে আসতে পারব, সে আশা নাই। আমি মারা গেলে স্যার লাশটা বাড়িতে পাঠায় দিয়েন।’এই হলো আবুল খায়ের।
রানা প্লাজার উদ্ধার অভিযানে আমি তাকে দেখেছি। দেখেছি আরো অনেক ঘটনায়। আসলে বাংলাদেশ ফায়ার ফায়ার সার্ভিসের প্রতিটা সদস্য যেন একেকজন আবুল খায়ের। দুর্ঘটনা বা আগুন লাগার পর প্রতিটা ঘটনায় দেখেছি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। আমার জানা মতে, শুধু আগুন নেভানোর কাজ করতে গিয়েই গত সাত বছরে অন্তত ২০ জন ফায়ার সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
আহত হয়েছে আরও অনেকে। জানি না কোন পদক জুটেছে কী না তাদের! এই তো গতবছর সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন নেভাতে গিয়ে অন্তত ছয়জন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীর প্রাণ যায়। আহত হয় অন্তত ২১ জন। বছর তিনেক আগে বনানীতে ফায়ার সার্ভিসের উঁচু ল্যাডারে (মই) উঠে এফ আর টাওয়ারের আগুন নেভানো ও আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার কাজ করতে হিয়ে সোহেল নামে এক ফায়ার কর্মী মারা যান। এমন ঘটনা অনেক।
পুরান ঢাকানর চকবাজাররে আগুন নেভানোর কাজ শেষ করার পর ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের দেখেছি, অভিযান সম্পন্ন করার পর তারা এতটাই ক্লান্ত যে, গাড়ির সামনের আসনে এমন কী গাড়ির ছাদেও ঘুমাচ্ছিলেন। আমি একবার পত্রিকায় লিখেছিলাম, বীরের বাহিনী ফায়ার সার্ভিস। সবাইকে মনে করিয়ে দেই, প্রতিষ্ঠানটার পুরো নাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত ভারতে ১৯৩৯-৪০ অর্থবছরে ফায়ার সার্ভিস সৃষ্টি করে। পরে আঞ্চলিক পর্যায়ে কলকাতা শহরের জন্য কলকাতা ফায়ার সার্ভিস এবং অবিভক্ত বাংলায় বাংলার জন্য বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিস সৃষ্টি করা হয়।
১৯৪৭ সালে বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসকে পূর্ব পাকিস্তান ফায়ার সার্ভিস নামে অভিহিত করা হয়। ১৯৫১ সালে এটি সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর সৃজিত হয়। ১৯৮২ সালে ফায়ার সার্ভিস পরিদপ্তর, সিভিল ডিফেন্স পরিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্ধার পরিদপ্তর-এই তিনটি পরিদপ্তরের সমন্বয়ে বর্তমান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরটি গঠিত হয়।শুরু থেকেই নানা সংকটে কাজ করতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসকে।
এই লেখায় যে আবুল খায়েরের কথা বলছিলাম, যার জীবনটা বীরের, গোটা দেশের সব বাহিনী মিলে যেখানে একজন খায়ের বিরল, সেই খায়েরের সংসার চলে অতিকষ্টে। ছেলেটা তার লেগুনা চালায়। স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত বলে জানতাম। অনেকদিন ধরে খোঁজ জানি না।কিছুটা আধুনিকায়ন হলেও আবুল খায়েরের মতোই নানা সংকটে আমাদের ফায়ার সার্ভিস। তারপরেও দেখবেন, দিন হোক, গভীর রাত হোক, একটা ইমার্জেন্সি কলেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সাইরেন বাজিয়ে সবার আগে হাজির ঘটনাস্থলে।
অবশ্য আরও অনেক বাহিনীর সদস্যদের ঘটনাস্থলে দেখবেন। আসলে সবাই কম-বেশি কাজ করে। কিন্তু আমার সবসময় মনে হয়েছে, ফায়ার সার্ভিস অসাধারণ এক বাহিনী। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস প্রতিটা সদস্য আমার বীর মনে হয়। মনে হয়, অন্য অনেক বাহিনীর মতো আধুনিক যন্ত্রাপাতি বা পেশাদারিত্ব থেকে হয়তো তারা অনেক পিছিয়ে কিন্তু
ফায়ার সার্ভিসের প্রতিটা সদস্য মমত্ববোধ নিয়ে, মানবপ্রেম নিয়ে, নিরলস চেষ্টায় সবার থেকে এগিয়ে। তাই সুযোগ পেলেই আমি বলি তাদের জন্য লিখি। বাংলাদেশে আনসাং হিরো শব্দটা আসলে তাদের জন্যই। যখন তখন আগুন লাগার আর দুর্ঘটনার এই শহরে, দুর্যোগের এই দেশে তারাই আসল নায়ক। এই বাহিনীর প্রতিটা সদস্যকে তাই ভালোবাসা ও স্যালুট।



