শরিফুল হাসান
‘বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা/এর যতো মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা/স্বর্গ কি হবে না কেনা?…’সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ঢুকতেই চোখে পড়বে ফলকের এই লেখাটি। বীরের রক্তস্রোতকে জাতি কতটা গুরুত্ব দেয়, সে প্রশ্নের উত্তরও যেন মিলেছিল গতকাল ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ৩৯তম বিজয় দিবসে।গতকাল দিনভর স্মৃতিসৌধে মানুষের আগমন, ফুলে ফুলে ভরে ওঠা বেদি, নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে কিংবা চোখের পানি ফেলে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা—এসবই বলে দিচ্ছিল জাতি ভোলেনি একাত্তরের শহীদদের, ভোলেনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।শুধু জাতীয় স্মৃতিসৌধই নয়, গতকাল সারা দেশেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আর শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে উদ্যাপিত হয় বিজয় দিবস। রাজধানীতে বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু হয় তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে। গতকাল সকাল সাড়ে সাতটা। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে তখনো ভোরের কুয়াশা। বেদি থেকে কুয়াশায় আড়াল হয়ে গিয়েছিল মূল স্মৃতিস্তম্ভ। সামান্য দূরের জিনিসও অস্পষ্ট। কিন্তু কনকনে সেই শীতে স্মৃতিসৌধে প্রবেশের অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ। হাতে নানা ব্যানার। তাতে লেখা, ‘বিজয় দিবস অমর হোক’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই’, ‘রাজাকারমুক্ত দেশ চাই’ ইত্যাদি। সবার মুখেই স্লোগান, কেউ কেউ গাইছিল দেশাত্মবোধক গান। চোখে-মুখে তাদের বিজয়ের উত্সব।রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সকাল সাতটা ৩৫ মিনিটে আসেন স্মৃতিসৌধে। তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করেন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্য ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।রাষ্ট্রপতির পর স্পিকারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে।স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ছাড়াও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সারা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিজয় দিবস উদ্যাপন করেছে।স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল: রাষ্ট্রপতি বের হওয়ার আগ পর্যন্ত স্মৃতিসৌধ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। ফলে পৌনে আটটা পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে মূল ফটকের বাইরেই অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি চলে যাওয়ার পর স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল নামে। মূল ফটকে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো আছড়ে পড়ে মানুষ। ছুটতে থাকে স্মৃতিসৌধের দিকে। তাদের অনেকেরই মাথায় বাঁধা জাতীয় পতাকা, মুখে লাল-সবুজের চিহ্ন।স্রোতের মতো মানুষ আসছিল সাভারে। বৃদ্ধ, যুবক, তরুণ, গৃহবধূ—সবাই ছিল সেই দলে। মায়ের কোলে চড়ে কিংবা বাবার হাত ধরে শিশুরাও এসেছিল স্মৃতিসৌধে। এই ভিড়ের মধ্যেই সকাল সোয়া আটটার দিকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।সকাল নয়টার দিকে কুয়াশা কাটে। আসে সকালের রোদ। আকাশের বুক চিরে গৌরবে যেন মাথা উঁচু করে তোলে স্মৃতিস্তম্ভ। ভিড়ও ক্রমেই বাড়তে থাকে। মূল ফটক থেকে বেদি পর্যন্ত আসতে সবার লেগে যাচ্ছিল দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। তবু কারও মুখে ক্লান্তি নেই, বরং সবাই ফুল দিতে পেরে যেন আনন্দিত।বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া: স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন সময়ের দাবি। আর সেই বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।তবে এই বিচার যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়, সে জন্য সরকারকে সতর্ক থাকতে বলেছেন বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাংসদ রাশেদ খান মেনন বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুতই বিচার হবে। এই বিচার দেরি না করতে আহ্বান জানান সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের আহ্বায়ক ও পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামালার বিচার হয়েছে। জাতি এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়।মুক্তিযোদ্ধারা যা বললেন: আহত অনেক মুক্তিযোদ্ধা হুইল চেয়ারে করে আসেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিভিন্ন কমিটির ব্যানারেও এসেছিলেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা।৩ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ এনামুল হক। প্রথম আলোকে তিনি বললেন, ‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্রমেই সে স্বপ্ন ফিকে হয়েছে।’ নতুন করে দেশ গড়ার জন্য তিনি তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানান।বৃদ্ধ সাদেক আলী যুদ্ধ করেছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরে। তিনি জানান, কিছু পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশ। কিন্তু সে দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে পাচ্ছেন না।আহত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) জালাল আহমেদ স্মৃতিচারণা করে বললেন, ‘আমরা এক প্লাটুন সেনা নিয়ে পুরো ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছি। আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। কিন্তু স্বাধীন দেশে অনেক সম্ভব কাজকেও আমরা অসম্ভব করে তুলেছি।’স্বজনেরা কাঁদলেন: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান বেদিতে ফুল দিয়ে নীরবে হাঁটছিলেন মূল স্তম্ভের পাশ দিয়ে। কেমন লাগছে? জানতে চাইলে কিছুটা সময় নীরব থাকেন। এরপর বলেন, ‘এত মানুষ। ভালোই লাগছে। তবে কষ্ট হয়, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এখনো সক্রিয়। যখন দেখি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখনো হয় না।’ তিনি সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে সাতটি গ্রাম করার কথা চূড়ান্ত হলেও এখনো সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়নি। সরকার যেন দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়। আর গ্রামগুলোর নামের আগে যেন বীরশ্রেষ্ঠ থাকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুনিরুজ্জামানের ছেলে আবু মুসা মাসুদুজ্জামান, শহীদ আব্দুস সামাদের ছেলে আবু জাফর, শহীদ জহরলাল রাজভবের নাতনি স্বপ্না রানীসহ শহীদ পরিবারের সন্তান ও স্বজনেরা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের অগ্রজ অনেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না দেখে মারা গেছেন। কিন্তু তাঁরা বিচার দেখে যেতে চান। ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ স্লোগান দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানান তাঁরা।সাধারণ মানুষের ভাবনা: সাভারের বাইপাইল থেকে আসা যুবক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, কয়েক বছর ধরেই তিনি নিয়মিত বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে আসেন। তাঁর দাবি, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় হয়েছে, এবার যুদ্ধাপরাধীদের ধরা হোক।ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষিকা ফেরদৌসি সুলতানা বেদিতে একটি গোলাপ দিলেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ছাড়লেন চত্বর। বললেন, ‘আমাদের বাবা-চাচারা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে আমরা কতটা অর্থবহ করতে পেরেছি, সেটি বিচারের সময় এসেছে।’বাবা মিজানুর রহমানের সঙ্গে এসেছিলেন চার বছরের শিশু মীম। সে জানাল, আজ বিজয় দিবস। তাই এসেছে। এখন খুব ভালো লাগছে।স্মৃতিসৌধ চত্বরে পাহারা দিচ্ছিলেন নিরাপত্তা রক্ষাকারী কর্মী জয়পুরহাটের আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, বিজয়ের দিনে এখানে দায়িত্ব পালন করে তাঁর অনেক বেশি ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে দেশের জন্য কিছু করতে পারছেন।মুগ্ধ বিদেশিরাও: অনেক বিদেশিও এসেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিজয় উত্সব দেখতে। অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড কারটিন, বিচারপতি মুরারি কেল্লাম, অধ্যাপক গ্রেগ রেইনহারডাটসহ আট সদস্যের একটি দল এসেছিল। একসঙ্গেই তাঁরা শহীদদের বেদিতে ফুল দেন। ডেভিড বলেন, ‘বিজয়ের এই উত্সব দেখে আমরা মুগ্ধ। এভাবে সবাই মিলে বিজয় উত্সব করা যায়, তা আমাদের জানা ছিল না।’কঠোর নিরাপত্তা: বিজয় দিবস ঘিরে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রবেশপথসহ সাভারের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ছিল র্যাব ও পুলিশের কড়া পাহারা।বিডিআরের (তত্কালীন ইপিআর) সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত রাইফেলস স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম। এ ছাড়া ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবাসিক হল, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।



