শরিফুল হাসান
বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্তে এখনো অটল মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রেজাক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বিষয়টি অবহিত করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপি ও মালয়েশিয়ার ইংরেজি দৈনিক স্টার-এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে কমনওয়েলথ দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে কথা বলেন। এ সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পুনরায় জনশক্তি নেওয়ার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। নাজিব রেজাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছি। তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলেছি, বাংলাদেশের অনেক জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অবৈধ তত্পরতার মাধ্যমে এখানে লোক পাঠিয়ে বাজার নষ্ট করেছে। তাদের কারণে অনেক শ্রমিক প্রতারিত হয়েছে। অনেক শ্রমিক দেশে তাদের সর্বস্ব বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় এসে বিপদে পড়েছিল। আমরা এ সমস্যা প্রতিরোধ করতে চাই। তাই বাংলাদেশ থেকে আমরা আপাতত শ্রমিক নেব না।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইলিয়াছ আহমেদ বলেন, বিষয়টি এখনো তাঁরা জানেন না। তবে অর্থনৈতিক মন্দার কারণেই মূলত মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রেখেছে। মন্দা কেটে গেলে এবং দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা পূরণ করতে পারলে দেশটি অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে। আর এ জন্য কিছুটা সময় লাগবে। এ ব্যাপারে সরকারের তত্পরতা চলবে।বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, খবরটি খুবই দুঃখজনক। কিন্তু কেন, কী কারণে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের বাজারটা নষ্ট হলো, সে ঘটনার এখনো সুষ্ঠু তদন্ত হলো না। মালয়েশিয়ার কথা উঠলেই ঢালাওভাবে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এ ঘটনায় মালয়েশিয়ার সরকারেরও দায় ছিল। তারা যে লোক লাগবে, তার চেয়ে অতিরিক্ত লোকের চাহিদাপত্র অনুমোদন করেছিল। এরপর বাংলাদেশ দূতাবাসও তদন্ত না করে সেটি সত্যায়িত করেছিল। এ বিষয়ে বারবার বলার পরও সরকার কোনো প্রস্তুতি নেয়নি। কাজেই এ ঘটনায় সরকারের দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।এ বছরের মার্চে মালয়েশিয়ার সরকার বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং ৫৫ হাজার ভিসা বাতিল করে। মালয়েশিয়ার এ সিদ্ধান্ত জানার পর বাংলাদেশ কূটনৈতিক পর্যায়ে নানা তত্পরতা শুরু করে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মালয়েশিয়া যান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বিভিন্ন সময়ে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করেন। কিন্তু তার পরও মালয়েশিয়ার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।আগামী দু-তিন বছরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে পাঁচ লাখ কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল। এ ঘোষণার অংশ হিসেবে এ বছর ৫৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং হাইকমিশনের সময়োচিত পদক্ষেপের অভাবে শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে প্রথমবার মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর ২০০৩ সালে জনশক্তি রপ্তানি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই হয়। ২০০৬ সালের ২৩ মে মালয়েশিয়া সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর সে দেশে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হলেও কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশিদের নিয়োগ আবার স্থগিত করে। তারপর ২০০৮ সালে আবার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু করে। কিন্তু ২০০৯ সালের মার্চে মালয়েশিয়া আবারও শ্রমিক নেবে না বলে জানিয়ে দেয়।



