জঙ্গি হামলার আশঙ্কা শামীমের

Spread the love

সময় কমছে, উত্তাপ বাড়ছে

শরিফুল হাসান 


শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। ছুটছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। শোনাচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। করেছেন পাল্টাপাল্টি অভিযোগও। চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র এখন ভোটের উত্তাপ।আগামী রোববার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। সময় যত কমছে, ভোটের উত্তাপও তত বাড়ছে।আলোচিত মেয়র পদপ্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার গতকাল বৃহস্পতিবার প্রচারকাজে ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন।আইভীর পক্ষে গতকাল মাঠে নামেন সরকারদলীয় স্থানীয় সাংসদ সারাহ্ বেগম কবরী। তিনি বলেন, ‘মানুষ একসময় নারায়ণগঞ্জকে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে চিনত। আমি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভোট চেয়ে জয়ী হয়েছি। আজকে আইভীও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। সন্ত্রাসমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়তে আইভীর কোনো বিকল্প নেই।’শামীমের শঙ্কা, অন্যদের প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী শামীম ওসমান গতকাল প্রচার চালাননি। তিনি দুপুর ১২টায় তাঁর বাসায় জরুরিভাবে সাংবাদিকদের ডেকে নেন।শামীম ওসমান বলেন, ‘জরুরি কারণে আপনাদের ডাকতে হয়েছে। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে আমি দুটি বিষয় জানাতে চাই। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে কালোটাকা ছড়ানো হচ্ছে। এখন কালোটাকাসহ কিছু লোককে আটক করে বলা হবে, তারা শামীম ওসমানের লোক। তাদের কাছে দেয়ালঘড়ি থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমার দ্বিতীয় অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা করছি। নির্বাচন বানচাল করতে এটি করা হবে।’শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে। শহরের একটি বাড়িতে অপর দুই মেয়র পদপ্রার্থীর লোকজন বৈঠক করেছে। সেখানেই এসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত।’শামীম ওসমান বলেন, ৩০ অক্টোবর ও এর আগে-পরে নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের হামলা করে নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে। আমার কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে।’এ ব্যাপারে থানায় ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করছেন না কেন, এ প্রশ্নের জবাবে শামীম ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগ লেখা হচ্ছে। আধা ঘণ্টার মধ্যেই অভিযোগ দেওয়া হবে।’তবে গতকাল রাত আটটায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা বিশ্বাস লুৎফর রহমান বলেন, ‘তাঁর কাছে কেউ এ ধরনের কোনো অভিযোগ করেনি।’পুলিশ জানায়, থানায় এমন কোনো অভিযোগ কেউ করেনি।ভোটের আগ দিয়ে শামীম ওসমানের এসব অভিযোগ তোলার নেপথ্যে কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। এটা বুঝতে পেরে নির্বাচন বানচাল করতে ও মানুষকে ভয় দেখাতে জঙ্গি হামলার কথা বলা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ জানল না, অথচ শামীম ওসমান জঙ্গি হামলার বিষয়ে নিশ্চিত হলেন। তিনি কীভাবে এসব জানলেন? তাহলে কি তিনিই হামলার পরিকল্পনা করছেন? গোয়েন্দা সংস্থার উচিত, যারা এসব অভিযোগ করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত বিষয়টি উদ্ঘাটন করা।কালোটাকা ছড়ানোর ব্যাপারে শামীম ওসমানের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইভী বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষ। কালোটাকা তো দূরের কথা, সাদাটাকাও আমার নেই। আমার সম্পদ মানুষের ভালোবাসা। তবে নারায়ণগঞ্জে কারা কালোটাকা ছড়ায়, সেটি সবাই জানে।’শামীম ওসমানের অভিযোগ প্রসঙ্গে তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, কালোটাকা কারা ছড়াচ্ছে, সেটি সবাই জানে। প্রশাসনের উচিত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া। আর জঙ্গি হামলার কথা আগে থেকে একজন জানলেন কী করে? পুলিশের উচিত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া।অবশ্য আগের দিন বুধবার শামীম ওসমানের বিরুদ্ধেই কালোটাকা ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ করেছিলেন আইভী ও তৈমুর। গতকাল গণমাধ্যমে এ খবর বের হওয়ার পর শামীম ওসমান পাল্টা অভিযোগ তুললেন।শামীম ওসমানের জঙ্গি হামলার আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার শেখ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য এখনো নেই। তবে শামীম ওসমান কোথা থেকে এসব তথ্য জানলেন, তিনিই ভালো জানেন। নির্বাচন সামনে রেখে অনেকেই অনেক কথা বলে। তিনিও হয়তো তা-ই করেছেন। তবে তাঁর কাছে কোনো অভিযোগ থাকলে আমাদের দিন। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব।’সিদ্ধিরগঞ্জে আইভীর গণসংযোগ: সেলিনা হায়াৎ আইভী গতকাল সকাল সাড়ে নয়টায় শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, জেলা যুবলীগের সভাপতি আবদুল কাদির, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জি এম আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে গণসংযোগে নামেন। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, চৌধুরীবাড়ী, ধনকুণ্ডা, আদমজী বিহারি ক্যাম্প এলাকায় মানুষের কাছে ভোট চান। এ সময় অনেক লোক ঘর থেকে বের হয়ে এসে আইভীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।প্রচারকালে আইভী বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে আমাদের নারায়ণগঞ্জ গড়ব। এখানে কোনো সন্ত্রাসীর ঠাঁই হবে না। কারণ, নারায়ণগঞ্জের মানুষ সন্ত্রাস চায় না। আর মেয়র থাকাকালে আমি শহরে যেভাবে উন্নয়ন করেছি, তেমনি উন্নয়ন হবে সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দরে।’মাঠে নেমেছেন সাংসদ কবরী: গতকাল বিকেলে আইভীর পক্ষে ভোট চাইতে সিদ্ধিরগঞ্জের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যান নারায়ণগঞ্জের সরকারদলীয় সাংসদ সারাহ্ বেগম কবরী। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন।আইভীর পক্ষে নামার কারণ জানতে চাইলে কবরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইভী সৎ ও যোগ্য এবং আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতা। সে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র থাকার সময়ে নারায়ণগঞ্জে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে আইভীকে প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জকে সন্ত্রাসের বদনাম থেকে রক্ষা করতে আইভীকে নারায়ণগঞ্জবাসীর ভোট দেওয়া উচিত।দলীয় সমর্থন শামীম ওসমান পেলেও আইভীর পক্ষে কেন ভোট চাইছেন—এ প্রশ্নের জবাবে কবরী বলেন, ‘একজন লোকের চেয়ে দল অনেক বড়, দেশ আরও বড়। কাজেই কোনো একজন লোকের কারণে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করা ঠিক নয়। আর নারীর ক্ষমতায়নের জন্যও আমি আইভীর পক্ষে নেমেছি।’শামীমের পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতারা: দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও শামীম ওসমান গতকাল কোথাও গণসংযোগ করেননি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা গতকালও তাঁর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, মৃণাল কান্তি দাস, বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ।এ ছাড়া ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের নেতৃত্বে ১৮টি দল গতকাল শামীম ওসমানের জন্য গণসংযোগ করে।আনারস হাতে তৈমুর: তৈমুর আলম খন্দকার নিজ প্রতীক আনারস হাতে নিয়ে গতকাল শহরের আমলাপাড়া, কুমুদিনী ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন।গণসংযোগকালে তৈমুর বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে তিনি নারায়ণগঞ্জকে আধুনিক, পরিকল্পিত, দূষণমুক্ত নিরাপদ নগর হিসেবে গড়ে তুলবেন। প্রচারণাকালে তৈমুরের সঙ্গে ছিলেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহম্মেদ, জেলা বিএনপির নেতা জান্নাতুল ফেরদৌস, এ টি এম কামাল প্রমুখ।এ ছাড়া গতকাল তৈমুরের পক্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন, সাংসদ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, হারুনুর রশীদ, আশরাফ উদ্দিন নিজান, রেজাউল করিম, নাজিমউদ্দিন আলম, খায়রুল কবির, মোয়াজ্জেম হোসেন, হাবিব-উন-নবী খান, নূরে আরা সাফা, শিরিন সুলতানাসহ অর্ধশত কেন্দ্রীয় নেতা নারায়ণগঞ্জে আসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.