চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স (সিসিসি)

Spread the love

৪২ মাস, ৮৬ কোটি টাকা সবই অপচয়!

শরিফুল হাসান

.
.

বাংলাদেশ শিল্প রসায়ন সংস্থার বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স (সিসিসি) ১৪ মাসে চালুর কথা থাকলেও ৪২ মাসেও চালু হয়নি। কিন্তু কার্যাদেশ পাওয়া চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ওই প্রতিষ্ঠানটিকে ৮৬ কোটি টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে বিসিআইসি। তা ছাড়া এ পর্যন্ত দুই দফায় কার্যাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সেই সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও চালু হয়নি এই প্রতিষ্ঠান।
সিসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, যেভাবে কাজ চলছে তাতে সিসিসি চালুর আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। আর সিসিসি চালু হলেও তাতে বছরে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে সরকারকে।
অভিযোগ উঠেছে, বিসিআইসির বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবালের ভাই মোহাম্মদ পারভেজ বিদেশি ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অনৈতিকভাবে নানা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম না থাকলেও আর্থিক সংশোধনী এনে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিন কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চীনা প্রতিষ্ঠানটি বিসিআইসির কাছে ৫০ লাখ টাকা ধার চেয়েছে। সেটাও বিনা সুদে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই তারা আবার এক কোটি টাকা চেয়ে বিসিআইসিতে চিঠি দিয়েছে।
অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল। এখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই।’ আপনার ভাই সেখানকার স্থানীয় পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এই ভাইটি আসলে সেভাবে কিছু করত না। আমরাই তার খরচ চালাতাম। হঠাৎ করেই চীনা প্রতিষ্ঠানটি তাকে ভিড়িয়েছে। তাকে চীনও নেওয়ার কথা বলেছে। বুঝতে পেরে আমি তাকে সরিয়ে এনেছি। তবে চীনা ওই প্রতিষ্ঠানটি একটি নাবালক প্রতিষ্ঠান। তাই পুরো সিসিসি নিয়ে আমরা খুব বিপদে পড়েছি।’
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে চালু হওয়া সিসিসিতে পাঁচ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদিত হতো। কিন্তু বিএনপি সরকার ২০০২ সালে এটি বন্ধ করে দেয়। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এটি চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য ডব্লিউএএসটিসিএল নামে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিসিআইসির চুক্তি হয়। কথা ছিল ১৪ মাসের মধ্যে এটি চালু করতে হবে। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ১১৪ কোটি টাকা পাবে। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পটি চালু হয়নি। তবে ইতিমধ্যেই সেখানে ২৬৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদায়ন করা হয়ে গেছে। তাঁদের বেতন-বোনাসও দিতে হচ্ছে বিসিআইসিকে।

সিসিসির প্রকৌশলী ও বিসিআইসির কর্মকর্তারা বলছেন, এটি চালুর নামে পদে পদে অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। চুক্তি অনুযায়ী সিসিসি জিইজি (গ্যাস ইঞ্জিন জেনারেটর) উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুতে চলার কথা। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক মেগাওয়াটসম্পন্ন চারটি জিইজি কেনার কথা ছিল। কিন্তু তারা চুক্তি ভঙ্গ করে চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জিইজি কিনেছে। কিন্তু এই জিইজি দিয়ে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যাচ্ছে না। কয়েক দফা চেষ্টা করেও সিসিসি চালু করা যায়নি। এখন তারা এই অবস্থায়ই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছে।

কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে আমি খুব বেশি কথা বলতে চাই না। চীনারা বলছে, নববর্ষের জন্য যাবে। এরপর এসে তারা সিসিসি চালু করবে।’

বিসিআইসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীনা প্রতিষ্ঠানটি যে জিইজি কিনেছে, সেটা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো হলে অচিরেই জিইজি নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের চাহিদা ১ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। কিন্তু যে জিইজি কেনা হয়েছে, তা থেকে ন্যূনতম ৮০ ভাগ বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সমস্যার সমাধানে পিডিবি থেকে ৩৩ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে কারখানাটি উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে পিডিবির বিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদনে যেতে হলে প্রতি মাসে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পের অবস্থা খুবই বাজে।’

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সিসিসি চালুর কথা থাকলেও সেটি হয়নি। পরে সময় বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু তারপরেও না পারায় ৩১ মে ২০১৬ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু তাতেও এটি চালু হয়নি। এরপর তৃতীয় দফায় সময় না বাড়িয়ে এটা চালুর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখন আর এটি চালুর সম্ভাবনা নেই। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি সিসিসি থেকে বিসিআইসিকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে তাতে তারা বলেছে, সামনে চীনা নববর্ষ। কাজেই প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করা সব চীনা প্রকৌশলী দেশে ফিরতে উদ্গ্রীব। মার্চে তাঁরা আবার কাজ শুরু করবেন।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, যথা সময়ে উৎপাদন না হওয়ায় প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৬ লাখ টাকা। এদিকে সিসিসির লাভ-ক্ষতি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত বছরের ২৪ এপ্রিল একটি কমিটি করা হয়। কমিটি ৩ মে সিসিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিসিসি পূর্ণ উৎপাদনে গেলে বছরে আয় হবে ৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু বছরে ব্যয় হবে ৬০ কোটি টাকা। ফলে প্রতিবছর ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.