শাহবাগে বাংলাদেশের গণজাগরণ
শরিফুল হাসান

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে সংগঠিত এবং ঢাকার শাহবাগ চত্বরে সূচিত তরুণ প্রজন্মের এক আন্দোলন ২০১৩ সালের অধিকাংশ সময়জুড়ে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষিত হলে তার প্রতিবাদে বিকেলেই ‘বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক’ (বোয়ান) নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে এবং কিছু সচেতন মানুষ শাহবাগের জাদুঘরের সামনে জড়ো হন। সন্ধ্যার পর থেকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ চত্বরে প্রতিবাদী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত বাড়তে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও যোগ দেন। সবার দাবি, কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই।
বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ চত্বরে অবিরাম অবস্থান করতে থাকেন। তাঁদের মনে একটি সংশয় ছিল যে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ার পেছনে সরকারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর গোপন বোঝাপড়া কাজ করে থাকতে পারে। ৮ ফেব্রুয়ারি ডাকা হয় প্রথম মহাসমাবেশ। সেখানে কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি পুনরুচ্চাতি হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তিন মিনিটের নীরবতা কর্মসূচি পালিত হয় শাহবাগে। ১৫ ফেব্রুয়ারি দাবি তোলা হয় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার।
ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শাহবাগে অবিরাম অবস্থান চলে। এই আন্দোলনের ফলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে বিপুল জনমত সঞ্চারিত হয়। আন্দোলনকারীদের চাপের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধন করে রায়ের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের আপিল করার বিধান করা হয়। সংশোধিত আইনটি ফেব্রুয়ারি মাসেই সংসদে পাস হলে মার্চের প্রথম সপ্তাহে রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আপিল করে।
শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি বিএনপি প্রথম দিকে সমর্থন জানালেও পরে এটিকে সরকারদলীয় আন্দোলন আখ্যা দেয়। জামায়াত গোড়া থেকেই এর বিরোধিতা করে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগের প্রবল বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তা সমাজের বৃহত্তর অংশকেও বেশ আলোড়িত করে। একপর্যায়ে শাহবাগ চত্বরে বিপুলসংখ্যক মানুষের সপরিবারে উপস্থিতি লক্ষ করা যায়; নারী ও শিশুদের উপস্থিতিও ছিল ব্যাপক। আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল; গানে, কবিতায়, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত। এই আন্দোলনের ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করার পক্ষে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে একের পর এক মামলার রায় ঘোষিত হতে থাকে। কাদের মোল্লার রায়ের পর ট্রাইবুন্যাল আরও সাতটি মামলার রায় ঘোষণা করেন।



